নামাজ শিক্ষা · নতুনদের ও ফিরে আসাদের জন্য
নামাজ পড়ার নিয়ম, ধাপে ধাপে
দুই রাকাত নামাজে প্রথম আল্লাহু আকবার থেকে সালাম পর্যন্ত যা কিছু বলা ও করা হয়, সব। প্রতিটি ধাপে আছে আরবি, সহজ উচ্চারণ, অর্থ ও তার সূত্র।
অজু করুন, কিবলার দিকে মুখ করুন এবং নামাজের নিয়ত করুন। আল্লাহু আকবার বলুন, সূরা আল-ফাতিহা ও একটি ছোট সূরা পড়ুন, রুকু করুন, দাঁড়ান, দুটি সিজদা করুন, তারপর পরের রাকাতের জন্য দাঁড়ান। শেষ রাকাতের পর তাশাহহুদ ও দরুদের জন্য বসুন, এবং ডানে ও বামে আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বলে নামাজ শেষ করুন। নিচে ফজরের মতো দুই রাকাত নামাজের প্রতিটি ধাপ আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ দেওয়া হলো।
শুরুর আগে
- নামাজের ওয়াক্ত হয়েছে। প্রতিটি নামাজের নির্দিষ্ট সময় আছে (কুরআন ৪:১০৩)। আপনার শহরের আজকের নামাজের সময় দেখে নিন।
- আপনার অজু আছে। নামাজের জন্য অজু প্রয়োজন (দেখুন সহীহ বুখারী ১৩৫, সহীহ মুসলিম ২২৫)। দেখুন কীভাবে অজু করবেন (ইংরেজি), আর গোসল ফরজ হলে গোসল (ইংরেজি)।
- শরীর, কাপড় ও জায়গা পবিত্র, এবং নামাজে যতটুকু ঢাকা প্রয়োজন, শরীর ততটুকু ঢাকা।
- আপনি কিবলামুখী, অর্থাৎ মক্কার কাবার দিকে (কুরআন ২:১৪৪)। কিবলা ফাইন্ডার ব্যবহার করুন।
দুই রাকাত নামাজ, ধাপে ধাপে
এক রাকাত হলো দাঁড়ানো, রুকু ও দুটি সিজদার একটি চক্র। ফজর দুই রাকাত, তাই নিচের ধাপগুলো একটি পূর্ণ ফজরের নামাজ। বড় নামাজগুলোতে এই একই চক্র বারবার হয়।
নিয়ত করুন
মনে মনে নিয়ত করুন কোন নামাজ পড়তে যাচ্ছেন, যেমন ফজরের দুই রাকাত ফরজ। নিয়ত অন্তরের বিষয়; মুখে জোরে বলার প্রয়োজন নেই। নিয়ত সম্পর্কে দেখুন সহীহ বুখারী ১ ও সহীহ মুসলিম ১৯০৭।
তাকবিরে তাহরিমা বলুন
দুই হাত কান বা কাঁধ পর্যন্ত তুলে বলুন:
اللَّهُ أَكْبَرُ
আল্লাহু আকবার
আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
তাকবির দিয়ে নামাজে প্রবেশ করা হয় · সুনানে আবু দাউদ ৬১, জামে তিরমিযী ৩
এখন থেকে সিজদায় যেখানে কপাল রাখবেন সেদিকে তাকান, এবং স্থির থাকুন।
হাত বাঁধুন ও সানা পড়ুন
ডান হাত বাম হাতের উপর রাখুন এবং নিচু স্বরে শুরুর দোয়া পড়ুন:
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، وَتَبَارَكَ اسْمُكَ، وَتَعَالَى جَدُّكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ
সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিক, ওয়া তাবারাকাসমুক, ওয়া তাআলা জাদ্দুক, ওয়া লা ইলাহা গাইরুক
হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র এবং সকল প্রশংসা আপনার। আপনার নাম বরকতময়, আপনার মর্যাদা সমুচ্চ, এবং আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।
সুনানে আবু দাউদ ৭৭৫, জামে তিরমিযী ২৪৩
আশ্রয় চান, বিসমিল্লাহ বলুন ও সূরা আল-ফাতিহা পড়ুন
নিচু স্বরে বলুন:
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
আউযু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম
আমি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।
তারপর সূরা আল-ফাতিহা পড়ুন। এটি প্রতিটি রাকাতে পড়া হয় (দেখুন সহীহ বুখারী ৭৫৬, সহীহ মুসলিম ৩৯৪)।
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
রহমান, রহীম [১] আল্লাহ্র নামে [২]
ٱلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلْعَٰلَمِينَ
আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন
সকল ‘হাম্দ’ [১] আল্লাহ্র [২] , যিনি সৃষ্টিকুলের [৩] রব [৪],
ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
আর রাহমানির রাহীম
দয়াময়, পরম দয়ালু [১],
مَٰلِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ
মালিকি ইয়াওমিদ্দীন
বিচার দিনের মালিক [১]।
إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
ইয়্যাকা না'বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন
আমরা শুধু আপনারই ‘ইবাদাত [১] করি [২], এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি [৩],
ٱهْدِنَا ٱلصِّرَٰطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ
ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকীম
আমাদেরকে সরল পথের হিদায়াত দিন [১]
صِرَٰطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا ٱلضَّآلِّينَ
সিরাতাল্লাযীনা আন'আমতা আলাইহিম, গাইরিল মাগদূবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দোয়াল্লীন
তাদের পথ, যাদেরকে আপনি নি‘আমত দিয়েছেন [১], যাদের উপর আপনার ক্রোধ আপতিত হয়নি [২] এবং যারা পথভ্রষ্টও নয় [৩]
কুরআন ১:১-৭ · অডিওসহ সূরা আল-ফাতিহা পড়ুন। তারপর আমীন বলুন (হে আল্লাহ, কবুল করুন)।
টীকা
১:১ সূরার নাম ও কিছু বৈশিষ্ট্য: সূরা আল-ফাতিহা-ই সর্বপ্রথম কুরআন মাজীদের একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসাবে রাসূলের প্রতি নাযিল হয়েছে। [তাবারী, কাশশাফ, আল-ইতকান] সৰ্বপ্রথম অহীর মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে আয়াত বা সূরার অংশ নাযিল হয় তা হচ্ছে সূরা ‘আল-‘আলাক’-এর প্রাথমিক আয়াত কয়টি। [দেখুন, বুখারী: ৩] সূরা আল-মুদ্দাসসির-এর প্রাথমিক কতক আয়াত এর কিছুদিন পর নাযিল হয়। [বুখারী ৪৯২২, ৪৯২৪] কিন্তু এই খণ্ড আয়াতসমূহ নাযিল হওয়ার মধ্যে একটিও পূর্ণাঙ্গ সূরা ছিল না। পূর্ণাঙ্গ সূরা প্রথম যা নাযিল হয়েছে, তা হচ্ছে সূরা আল-ফাতিহা। কুরআন মাজীদের ১১৪টি সূরার মধ্যে প্রত্যেকটির জন্য একটি নাম নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই নামকরণের ব্যাপারে কয়েকটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে কিছু নাম আছে কুরআন ও হাদীস ভিত্তিক, আর কিছু নাম রয়েছে আলেমদের ইজতিহাদ প্রসূত। কোনো কোনো সূরার নাম রাখা হয়েছে এর প্রথম শব্দ দ্বারা। কোনো সূরায় আলোচিত বিশেষ কোনো কথা কিংবা তাতে উল্লেখিত বিশেষ কোনো শব্দ নিয়ে তা-ই নাম হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো সূরার নামকরণ করা হয়েছে তার আভ্যন্তরীণ ভাবধারা ও বিষয়বস্তুকে সম্মুখে রেখে। কয়েকটি সূরার নাম রাখা হয়েছে কোনো একটি বিশেষ ঘটনার প্রতি খেয়াল রেখে। সূরা আল-ফাতিহার নাম রাখা হয়েছে কুরআনে এর স্থান-মর্যাদা, বিষয়বস্তু-ভাবধারা, এর প্রতিপাদ্য বিষয় ইত্যাদির প্রতি লক্ষ্য রেখে। এদিক দিয়ে সূরা আল-ফাতিহার স্থান সর্বোচ্চে। কেননা অন্যান্য সূরার ন্যায় সূরা আল-ফাতিহার নাম মাত্র একটি নয়, অনেকগুলো। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হচ্ছে, ১. ‘ফাতিহাতুল কিতাব' (فَاتِحَةُ الْكِتَا بِ) কুরআনের চাবি-কাঠি। কেননা এই সূরা দ্বারাই কুরআনের সূচনা হয়, কুরআনের প্রথমেই একে রাখা হয়েছে। কুরআন খুলে সর্বপ্রথম এই সূরা-ই পাঠ করতে হয়। কখনও কখনও এই নামের রূপান্তর হয়ে ‘ফাতিহাতুল কুরআন’ হয়ে থাকে। এতে অর্থের দিক দিয়ে কোনো পার্থক্যই সূচিত হয় না। ২. ‘উম্মুল কিতাব’ (اُمُّ الْكِتَا بِ) আরবী ভাষায় ‘উম্ম্’ বলা হয় সর্ব ব্যাপক ও কেন্দ্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন জিনিসকে। সৈন্য বাহিনীর ঝান্ডাকে বলা হয় উম্ম্। কেননা সৈনিকবৃন্দ তারই ছায়াতলে সমবেত হয়ে থাকে। মক্কা নগরের আর এক নাম হচ্ছে, ‘উম্মুল কুরা’-‘জনপদসমূহের মা’। কেননা হজের মৌসুমে সকল গোত্র ও জাতি থেকে মানুষেরা এই শহরেই একত্রিত হয়। ইমাম বুখারী কিতাবুত্ তাফসীর-এর শুরুতে লিখেছেন, এর নাম ‘উম্মুল কিতাব' এজন্য বলা হয়েছে যে, কুরআন লিখতে ও পড়তে তা-ই প্রথম এবং সালাতের কিরাতেও তা-ই প্রথম পাঠ করতে হয়। ৩. ‘সূরাতুল-হামদ’ (سُوْرَةُ الْحَمْد) তা'রীফ ও প্রশংসার সূরা। হামদ এই সূরার প্রথম শব্দ। ইহাতে আল্লাহর হামদ-তা'রীফ-প্রশংসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে, সে জন্য এটি এ সূরার জন্য যথার্থ নাম। ৪. ‘সূরাতুস-সালাত’ (سُوْرَةُ الصَّلَاةِ) - অর্থাৎ সালাতের সূরা। যেহেতু সব সালাতের সব রাকাতেই এটি পাঠ করতে হয় সেজন্যই এই নামকরণ হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (لَا صَلاَة لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ) অর্থাৎ, ‘যে ব্যক্তি সালাতে সূরা ফাতিহা পড়বে না, তার সালাত হবে না।’ [বুখারী ৭৫৬, মুসলিম ৩৯৪] ৫. ‘আস্-সাব্‘উল মাসানী’ (السَّبْعُ الْمَثَانِىْ)—'বার বার পাঠ করার সাতটি আয়াত'। সূরা ফাতিহার সাতটি আয়াত রয়েছে এবং তা বার বার পাঠ করা হয় বলে এর আরেক নাম ‘সাব্'উমাসানী’। অথবা সালাতের প্রতি রাকাতেই তা পড়া হয় বলেই এর এই নাম। [আল-কাশশাফ, বাগভী, তাফসীর ইবন কাসীর, আল-ইতকান, আত-তাফসীরুস সহীহ] আয়াত সংখ্যা : এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই যে, সূরা ফাতিহার মোট সাতটি আয়াত রয়েছে। এ জন্য হাদীস শরীফে একে সাতটি পুনরাবৃত্তিমূলক আয়াতের সূরা (السَّبْعُ الْمَثَانِىْ) বলা হয়েছে। [বুখারী ৪৭০৩] কুরআনুল কারীমেও একে এ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। [সূরা আল-হিজর ৮৭] এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জেগেছে, সূরার পূর্বে যে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম" উল্লেখ করা হয়েছে তা সূরা ফাতিহার মধ্যে গণ্য আয়াত ও এর অংশ, না তা হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র কোনো জিনিস? এর উত্তরে বলা যায়, কোনো কোনো সাহাবী “বিসমিল্লাহ"কে সূরা ফাতিহার অংশ মনে করতেন। পক্ষান্তরে অপর সাহাবীগণের মতে এটি এ সূরার অংশ নয়। তবে মদীনা শরীফে সংরক্ষিত কুরআনে এটিকে সূরা আল-ফাতিহার অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ কিরাআতেও এটিকে সূরার প্রথমে একটি আয়াত ধরা হয়েছে এবং ‘সিরাতাল্লাযীনা আন'আমতা ‘আলাইহিম গাইরিল মাগদূবি ‘আলাইহিম ওলাদ দাল্লীন’ পর্যন্ত পুরোটাকে একই আয়াত ধরা হয়েছে। আর যারা বিসমিল্লাহকে সূরার আয়াত হিসেবে গণ্য করেননি তারা (صِراطَ الَّذِيْنَ اَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ) পর্যন্ত এক আয়াত, আর তার পরের অংশ (غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّيْنَ) কে আলাদা আয়াত সাব্যস্ত করে সাত আয়াত পূর্ণ করেছেন। [বাগভী] নাযিল হওয়ার স্থান: গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে যে, সূরা আল-ফাতিহা মক্কায় অবতীর্ণ সূরা। অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, এটি মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। আবার কারও মতে এটা একবার মক্কায় এবং আরেকবার মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তাছাড়া এর অর্ধেক মক্কায় এবং অপর অর্ধেক মদীনায় নাযিল হয়েছে বলেও কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এসব মত গ্রহণযোগ্য নয়। তার বড় প্রমাণ এই যে, সূরা আল-হিজর সর্বসম্মতভাবে মাক্কী। তার ৮৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আমরা আপনাকে সাতটি বার বার পঠনীয় আয়াত ও কুরআনে ‘আযীম প্রদান করেছি।’ এই বার বার পঠনীয় সাতটি আয়াতই হল সূরা আল-ফাতিহা। [বাগভী] তাছাড়া সালাত মক্কায়ই ফরয হয়েছিল এবং সূরা ফাতিহা ছাড়া কখনই সালাত পড়া হয়নি- এটাও সর্বসম্মত কথা। সূরার ফযীলত: সূরা আল-ফাতিহার ফযীলত বর্ণনায় অসংখ্য হাদীস এসেছে। যেমন হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন, আমার এবং আমার বান্দার মধ্যে সালাতকে আমি দু’ভাগে বিভক্ত করেছি, আর আমার বান্দার জন্য তা-ই রয়েছে যা সে চায়। বান্দা (اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ) বললে আল্লাহ্ বলেন, আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে; আর যখন সে (الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ) বলে তখন আল্লাহ্ বলেন, আমার বান্দাহ্ আমার গুণ-গান করেছে। আর যখন সে বলে (مٰلِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ) তখন আল্লাহ্ বলেন, আমার বান্দাহ আমাকে সম্মানে ভূষিত করেছে। আর যখন সে বলে (اِيَّاكَ نَعْبُدُ وَاِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ) তখন আল্লাহ্ বলেন, এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে, আর আমার বান্দার জন্য তা-ই রয়েছে যা সে চায়। আর যখন সে বলে (اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَـقِيْمَ ـ صِرَاطَ الَّذِيْنَ اَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ـ غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّيْنَ) তখন আল্লাহ্ বলেন, এটা আমার বান্দার জন্য আর আমার বান্দার জন্য তা-ই রয়েছে যা সে চায়।” [মুসলিম ৩৯৫] অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ তা'আলা উম্মুল কুরআন এর অনুরূপ কোনো কিছু তাওরাত ও ইঞ্জীলে নাযিল করেননি। আর তা হলো পুনঃ পুনঃ পঠিতব্য সাতটি আয়াত, যা আমি (আল্লাহ্) এবং বান্দাদের মাঝে দু'ভাগে বিভক্ত।" [নাসায়ী ৯১৩, তিরমিযী ৩১২৫] অন্য বর্ণনায় এসেছে, ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও জিবরিল ‘আলাইহিস্ সালাম উপবিষ্ট ছিলেন। তখন হঠাৎ উপরের দিকে (এক ধরণের) শব্দ শুনা গেল। তখন জিবরিল ‘আলাইহিস সালাম আকাশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বললেন, এটা আকাশের একটি দরজা যা কখনও খোলা হয় নি। ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, অতঃপর সে দরজা দিয়ে একজন ফিরেশতা অবতরণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললেন, আমি আপনাকে দু’টি নূরের সুসংবাদ দিচ্ছি যা আপনাকে দেয়া হয়েছে, যা আপনার পূর্বে কোনো নবীকে দেয়া হয়নি। সূরা আল-ফাতিহা ও সূরা আল-বাকারাহ্ এর শেষাংশ। এর একটি অক্ষর পাঠের মাধ্যমে চাওয়া বস্তুও তাকে দেয়া হবে। [মুসলিম ৮০৬] অনুরূপভাবে আবু সায়ীদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা এক সফরে এক জায়গায় অবতরণ করলাম। সেখানে একটি মেয়ে এসে বলল, এ গ্রামের প্রধানকে সাপে দংশন করেছে, তোমাদের মধ্যে কেউ কি ঝাঁড়-ফুঁক করার মত আছে? তখন মেয়েটির সাথে এক ব্যক্তি গিয়ে তাকে ঝাঁড়-ফুঁক করে এল, আমরা তাকে ঝাঁড়-ফুঁক জানে বলে মনে করতাম না। এতে গ্রাম প্রধান আরোগ্য লাভ করেন। ফলে সে তাকে ত্রিশটি বকরী উপহার দিলেন এবং আমাদেরকে দুধ পান করালেন। আমাদের সঙ্গীকে আমরা বললাম তুমি কি ভালো ঝাঁড়-ফুঁক করতে জান? সে বলল, আমি শুধু উম্মুল কুরআন দ্বারা ফুঁক দিয়েছি। আমরা সবাইকে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে পৌঁছে জিজ্ঞেস না করা পর্যন্ত তোমরা এগুলোকে কিছু কর না। অতঃপর মদীনা পৌঁছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে সব কথা খুলে বললাম। তিনি বললেন, সে কিভাবে জানলো যে, এটি একটি ঝাঁড়-ফুঁক করার বিষয়! তোমরা এগুলো বন্টন করে নাও এবং আমাকে তোমাদের সাথে এক ভাগ দিও। [মুসলিম ২২০১] অন্য বর্ণনায় আবু সা’য়ীদ ইবনুল মু'আল্লা বলেন, আমি সালাত আদায় করছিলাম এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডাকলেন। আমি সালাত শেষ করেই তার ডাকে সাড়া দিলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, আমার কাছে আসা থেকে তোমাকে কিসে বারণ করেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি সালাত আদায় করছিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা'আলা কি বলেন নি যে, 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দাও; যখন তোমাদেরকে ডাকেন সে বস্তুর দিকে যা তোমাদেরকে জীবন দান করবে।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘মসজিদ থেকে বের হবার পূর্বে আমি তোমাকে কুরআনের সবচেয়ে মহান সূরা শিক্ষা দিব।’ ... অতঃপর তিনি বললেন, তাহলো, (اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ)। এটি হলো সাতটি পূনঃ পূনঃ পঠিতব্য আয়াত এবং মহান কুরআন যা আমাকে দান করা হয়েছে। [বুখারী ৪৬৪৭] উপর্যুক্ত হাদীসসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এ সূরাটি সবচেয়ে মহান সূরা। এ সূরা যদিও আল্লাহ তা‘আলার নিজস্ব কালাম, তবুও এর ধরন রাখা হয়েছে প্রার্থনামূলক। আল্লাহর নিকট মানুষকে কোন জিনিসের প্রার্থনা করতে হবে, সে প্রার্থনার নিয়ম ও প্রণালী কী হওয়া উচিত; আল্লাহর সম্মুখে মানুষের প্রকৃত স্থান কোথায় এবং সেই দৃষ্টিতে মানুষের আকীদা-বিশ্বাস কিরূপ হওয়া বাঞ্ছনীয়, তার জন্য বিশুদ্ধ দীন কী হতে পারে, এই দুনিয়ার অসংখ্য পথের মধ্যে হিদায়াতের পথ - আল্লাহর সন্তোষ লাভের সঠিক পথ - কোনটি, আর কোন পথে নাযিল হয় তাঁর অভিশাপ; এসব কথাই বিশ্ব-মানবের সম্মুখে সুষ্পষ্ট করে তুলে ধারা হয়েছে এই সূরার মাধ্যমে। আল্লাহর বিশেষ পরিচয় ও গুণাবীল অনিবার্য পরিণতি হিসেবে কিয়ামত-বিচারের দিন এবং রিসালাত ও নবুওয়তের উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দিক দিয়ে এ সূরাকে কুরআনের ভূমিকা বলা যেতে পারে। কুরআনের সমগ্র সূরার মধ্যে এর গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণেই একে কুরআনের শুরুতে স্থাপন করা হয়েছে। অন্য কথায় ত্রিশ পারা কুরআন মাজীদে যা কিছু আলোচিত হয়েছে, অতি সংক্ষেপে তাই বর্ণিত হয়েছে এ ছোট্ট সূরাটিতে অথবা বলা যায়, পূর্ণ কুরআন এ ছোট্ট সুরাটিরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা। [১] সাধারণত আয়াতের অনুবাদে বলা হয়ে থাকে, পরম করুণাময়, দয়ালু আল্লাহ্র নামে শুরু করছি। এ অনুবাদ বিশুদ্ধ হলেও এর মাধ্যমে এ আয়াতখানির পূর্ণভাব প্রকাশিত হয় না। কারণ, আয়াতটি আরও বিস্তারিত বর্ণনার দাবী রাখে। প্রথমে লক্ষণীয় যে, আয়াতে আল্লাহ্র নিজস্ব গুণবাচক নামসমূহের মধ্য হতে ‘আর-রাহমান ও আর-রাহীম' এ দু’টি নামই এক স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। ‘রহম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ। এই ‘রহম’ ধাতু হতেই ‘রহমান’ ও ‘রহীম' শব্দদ্বয় নির্গত ও গঠিত হয়েছে। ‘রহমান' শব্দটি মহান আল্লাহ্র এমন একটি গুণবাচক নাম যা অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। [তাবারী] কুরআন ও হাদীসে এমনকি আরবদের সাহিত্যেও এটি আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। পক্ষান্তরে ‘রহীম' শব্দটি আল্লাহ্র গুণ হলেও এটি অন্যান্য সৃষ্টজগতের কারও কারও গুণ হতে পারে। তবে আল্লাহ্র গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারও গুণ হলে সেটা সে একই অর্থে হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। প্রত্যেক সত্তা অনুসারে তার গুণাগুণ নির্দিষ্ট হয়ে থাকে। এখানে একই স্থানে এ দুটি গুণবাচক নাম উল্লেখ করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কোন কোন তাফসীরকার বলেছেন যে, আল্লাহ্ ‘রহমান’ হচ্ছেন এই দুনিয়ার ক্ষেত্রে, আর ‘রাহীম’ হচ্ছেন আখেরাতের হিসেবে। [বাগভী] [২] নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সর্বপ্রথম ‘ইক্রা বিসমি' বা সূরা আল-‘আলাক এর প্রাথমিক কয়েকটি আয়াত নাযিল হয়েছিল। এতে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র নাম নিয়ে পাঠ শুরু করতে বলা হয়েছিল। সম্ভবত এজন্যই আল্লাহ্র এই প্রাথমিক আদেশ অনুযায়ী কুরআনের প্রত্যেক সূরা’র প্রথমেই তা স্থাপন করে সেটাকে রীতিমত পাঠ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। বস্তুতঃ বিসমিল্লাহ প্রত্যেকটি সূরার উপরিভাগে অর্থ ও বাহ্যিক আঙ্গিকতার দিক দিয়ে একটি স্বর্ণমুকুটের ন্যায় স্থাপিত রয়েছে। বিশেষ করে এর সাহায্যে প্রত্যেক দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করাও অতীব সহজ হয়েছে। হাদীসেও এসেছে, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরার শেষ তখনই বুঝতে পারতেন যখন বিসমিল্লাহ নাযিল করা হতো।’ [আবু দাউদ ৭৮৮] তবে প্রত্যেক সূরার প্রথমে ও কুরআন পাঠের পূর্বে এ বাক্য পাঠ করার অর্থ শুধু এ নয় যে, এর দ্বারা আল্লাহ্র নাম নিয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার সংবাদ দেয়া হচ্ছে। বরং এর দ্বারা স্পষ্ট কণ্ঠে স্বীকার করা হয় যে, দুনিয়ার সমস্ত নিয়ামত আল্লাহ্র তরফ হতে প্রাপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে এ কথাও মেনে নেয়া হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের প্রতি যে দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন, বিশেষ করে দীন ও শরীয়াতের যে অপূর্ব ও অতুলনীয় নিয়ামত আমাদের প্রতি নাযিল করেছেন, তা আমাদের জন্মগত কোনো অধিকারের ফল নয়। বরং তা হচ্ছে আল্লাহ্ তা'আলার নিজস্ব বিশেষ মেহেরবানীর ফল। তাছাড়া এই বাক্য দ্বারা আল্লাহ্র নিকট এই প্রার্থনাও করা হয় যে, তিনি যেন অনুগ্রহপূর্বক তাঁর কুরআনুল কারীমের বাণী বুঝার ও তদনুযায়ী জীবন-যাপন করার তওফীক দান করেন। এ ছোট্ট বাক্যটির অন্তর্নিহিত ভাবধারা এটাই। তাই শুধু কুরআন তিলাওয়াত শুরু করার পূর্বেই নয় প্রত্যেক জায়েয কাজ আরম্ভ করার সময়ই এটি পাঠ করার জন্য ইসলামী শরীয়াতে নির্দেশ করা হয়েছে। কারণ, প্রত্যেক কাজের পূর্বে এটি উচ্চারণ না করলে তার মঙ্গলময় পরিণাম লাভে সমর্থ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিভিন্ন কথা ও কাজে এ কথাই ঘোষণা করেছেন। যেমন, তিনি প্রতিদিন সকাল-বিকাল বলতেন (بِسْمِ اللّٰهِ الَّذِيْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِه شَيْئٌ فِي الْاَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ)– “আমি সে আল্লাহ্র নামে শুরু করছি যার নামে শুরু করলে যমীন ও আসমানে কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারে না, আর আল্লাহ্ তো সব কিছু শুনেন ও সবকিছু দেখেন।" [আবুদাউদ ৫০৮৮, ইবন মাজাহ ৩৮৬৯] অনুরূপভাবে যখন তিনি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেন তাতে বিসমিল্লাহ্ লিখেছিলেন [বুখারী ৭], তাছাড়া তিনি যে কোনো ভাল কাজে বিসমিল্লাহ বলার জন্য নির্দেশ দিতেন। যেমন, খাবার খেতে [বুখারী ৫৩৭৬, মুসলিম ২০১৭, ২০২২], দরজা বন্ধ করতে, আলো নিভাতে, পাত্র ঢাকতে, পান-পাত্র বন্ধ করতে [বুখারী ৩২৮০], কাপড় খুলতে [ইবন মাজাহ ২৯৭, তিরমিয়ী ৬০৬], স্ত্রী সহবাসের পূর্বে [বুখারী ৬৩৮৮, মুসলিম ১৪৩৪], ঘুমানোর সময় [আবু দাউদ ৫০৫৪], ঘর থেকে বের হতে [আবুদাউদ ৫০৯৫], চুক্তিপত্র/ বেচা-কেনা লিখার সময় [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী ৫/৩২৮], চলার সময় হোঁচট খেলে [মুসনাদে আহমাদ ৫/৫৯], বাহনে উঠতে [আবু দাউদ ২৬০২], মসজিদে ঢুকতে [ইবনে মাজাহ ৭৭১, মুসনাদে আহমাদ ৬/২৮৩], বাথরুমে প্রবেশ করতে [ইবন আবি শাইবাহ ১/১১], হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করতে [সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকী ৫/৭৯], যুদ্ধ শুরু করার সময় [তিরমিযী ১৭১৫], শক্র দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ব্যাথা পেলে বা কেটে গেলে [নাসায়ী ৩১৪৯], ব্যাথার স্থানে ঝাড়-ফুঁক দিতে [মুসলিম ২২০২], মৃতকে কবরে দিতে [তিরমিযী ১০৪৬], এ ব্যাপারে আরও বহু সহীহ হাদীস এসেছে। আবার কোথাও কোথাও ‘বিসমিল্লাহ' বলা ওয়াজিবও বটে, যেমন যবাই করতে [বুখারী ৯৮৫, মুসলিম ১৯৬০] যেহেতু মানুষের শক্তি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ, সে যে কাজই শুরু করুক না কেন, তা যে সে নিজে আশানুরূপে সাফল্যজনকভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, এমন কথা জোর করে বলা যায় না। এমতাবস্থায় সে যদি আল্লাহ্র নাম নিয়ে কাজ শুরু করে এবং আল্লাহ্র অসীম দয়া ও অনুগ্রহের প্রতি হৃদয়-মনে অকুণ্ঠ বিশ্বাস জাগরুক রেখে তাঁর রহমত কামনা করে, তবে এর অর্থ এ-ই হয় যে, সংশ্লিষ্ট কাজ সুষ্ঠুরূপে সম্পন্ন করার ব্যাপারে সে নিজের ক্ষমতা যোগ্যতা ও তদবীর অপেক্ষা আল্লাহ্র অসীম অনুগ্রহের উপরই অধিক নির্ভর ও ভরসা করে এবং তা লাভ করার জন্য তাঁরই নিকট প্রার্থনা করে ।
১:২ [১] আরবী ভাষায় ‘হাম্দ’ অর্থ নির্মল ও সম্ভ্রমপূর্ণ প্রশংসা। গুণ ও সিফাত সাধারণতঃ দুই প্রকার হয়ে থাকে। তা ভালও হয় আবার মন্দও হয়। কিন্তু হাম্দ শব্দটি কেবল ভালো গুণ প্রকাশ করে। অর্থাৎ বিশ্ব জাহানের যা কিছু এবং যতকিছু ভালো, সৌন্দর্য-মাধুর্য, পূর্ণতা মাহাত্ম দান ও অনুগ্রহ রয়েছে তা যেখানেই এবং যে কোনো রূপে ও যে কোন অবস্থায়ই থাকুক না কেন, তা সবই একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই জন্য নির্দিষ্ট, একমাত্র তিনিই তাঁর মহান সত্তাই সে সব পাওয়ার অধিকারী। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্যই এর যোগ্য হতে পারে না। কেননা সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা তিনিই এবং তাঁর সব সৃষ্টিই অতীব সুন্দর। এর অধিক সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না-মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। তাঁর সৃষ্টি, লালন-পালন-সংরক্ষণ-প্রবৃদ্ধি সাধনের সৌন্দর্য তুলনাহীন। তাই এর দরুন মানব মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জেগে উঠা প্রশংসা ও ইচ্ছামূলক প্রশংসাকে ‘হামদ’ বলা হয়। এখানে এটা বিশেষভাবে জানা আবশ্যক যে, ‘আল-হামদু’ কথাটি ‘আশ-শুক্র’ থেকে অনেক ব্যাপক, যা আধিক্য ও পরিপূর্ণতা বুঝায়। কেউ যদি কোন নি‘আমত পায়, তা হলে সেই নি‘আমতের জন্য শুকরিয়া প্রকাশ করা হয়। সে ব্যক্তি যদি কোনো নি‘আমত না পায় (অথবা তার পরিবর্তে অন্য কোনো লোক নি‘আমতটি পায়) স্বভাবতই তার বেলায় এজন্য শুকরিয়া নয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি নি‘আমত পায়, সে-ই শুকরিয়া আদায় করে। যে ব্যক্তি নি‘আমত পায় না, সে শুকরিয়া আদায় করে না। এ হিসেবে ‘আশ-শুক্র লিল্লাহ' বলার অর্থ হতো এই যে, আমি আল্লাহ্র যে নি‘আমত পেয়েছি, সেজন্য আল্লাহ্র শুকরিয়া আদায় করছি। অপরদিকে 'আল-হামদুলিল্লাহ’ অনেক ব্যাপক। এর সম্পর্ক শুধু নি‘আমত প্রাপ্তির সাথে নয়। আল্লাহ্র যত নি‘আমত আছে, তা পাওয়া যাক, বা না পাওয়া যাক; সে নি‘আমত কোনো ব্যক্তি নিজে পেলো, বা অন্যরা পেলো, সবকিছুর জন্যই যে প্রশংসা আল্লাহ্র প্রাপ্য সেটিই হচ্ছে ‘হামদ’। এ প্রেক্ষিতে ‘আল-হামদুলিল্লাহ' বলে বান্দাহ্ যেন ঘোষণা করে, হে আল্লাহ্! সব নি‘আমতের উৎস আপনি, আমি তা পাই বা না পাই, সকল সৃষ্টিজগতই তা পাচ্ছে; আর সেজন্য সকল প্রশংসা একান্তভাবে আপনার, আর কারও নয়। কেউ আপনার প্রশংসা করলে আপনি প্রশংসিত হবেন আর কেউ প্রশংসা না করলে প্রশংসিত হবেন না-ব্যাপারটি এমন নয়। আপনি স্বপ্রশংসিত। প্রশংসা আপনার স্থায়ী গুণ। প্রশংসা আপনি ভালোবাসেন। আপনার প্রশংসা কোনো দানের বিনিময়ে হতে হবে এমন কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই। [ইবন কাসীর] আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, এখানে (اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ) ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ্র’ এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। أَحْمَدُ اللهَ ‘আমি আল্লাহ্র প্রশংসা করছি’ এ শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। এর কারণ সম্ভবত এই যে, ‘আহমাদুল্লাহ' বা ‘আমি আল্লাহ্র প্রশংসা করছি’ এ বাক্যটি বর্তমানকালের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ আমি বর্তমানকালে আল্লাহ্র প্রশংসা করছি। অন্যদিকে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বা ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ্র’ সর্বকালে (অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে) প্রযোজ্য। আর এ জন্যই হাদীসে বলা হয়েছে, اَفْضَلُ الدُّعَاءِ الْحَمْدُ لِلّٰهِ “সবচেয়ে উত্তম দো’আ হলো আল-হামদুলিল্লাহ।” [তিরমিযী ৩৩৮৩] কারণ, তা সর্বকাল ব্যাপী। অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ تَمْلَأُ الْمِيْزَانَ “আর ‘আল-হামদুলিল্লাহ' মীযান পূর্ণ করে।” [মুসলিম ২২৩] এ জন্য অধিকাংশ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিন-রাত্রির যিকির ও সালাতের পরের যিকির এর মধ্যে এ “আল হামদুলিল্লাহ" শব্দই শিখিয়েছেন। এ “আল-হামদুলিল্লাহ" পুর্ণমাত্রার প্রশংসা হওয়ার কারণেই আল্লাহ্ এতে খুশী হন। বিশেষ করে নি‘আমত পাওয়ার পর বান্দাকে কিভাবে আল্লাহ্র প্রশংসা করতে হবে তাও "আল-হামদুলিল্লাহ" শব্দের মাধ্যমে করার জন্যই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল শিখিয়ে দিয়েছেন। [দেখুন, ইবনে মাজাহ ৩৮০৫] এভাবে “আল-হামদুলিল্লাহ" হলো সীমাহীন প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার রূপ। আল্লাহ্র হামদ প্রকাশ করার ক্ষেত্র, মানুষের মন-মানষ, মুখ ও কর্মকাণ্ড। অর্থাৎ মানুষের যাবতীয় শক্তি দিয়ে আল্লাহ্র হামদ করতে হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ্র ‘হামদ বা প্রশংসা’ শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ রাখে। অনেকে মুখে ‘আল-হামদুলিল্লাহ' বলে, কিন্তু তার অন্তরে আল্লাহ্র প্রশংসা আসেনি, আর তার কর্মকাণ্ডেও সেটার প্রকাশ ঘটে না। [২] ‘সকল হামদ আল্লাহ্র’ এ কথাটুকু দ্বারা এক বিরাট গভীর সত্যের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। পৃথিবীর যেখানেই যে বস্তুতেই যাকিছু সৌন্দর্য ভালো প্রশংসার যোগ্য গুণ বা শ্রেষ্ঠত্ব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হবে, মনে করতে হবে যে, তা তার নিজস্ব সম্পদ ও স্বকীয় গৌরবের বস্তু নয়। কেননা সেই গুণ মূলতঃ তার নিজের সৃষ্টি নয়; তা সেই আল্লাহ্ তা'আলারই নিরঙ্কুশ দান, যিনি নিজের কুদরতে সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন। বস্তুতঃ তিনি হচ্ছেন সমস্ত সৌন্দর্য ও সমস্ত ভালোর মূল উৎস। মানুষ, ফেরেশতা, গ্রহ-নক্ষত্র, বিশ্ব-প্রকৃতি, চন্দ্ৰ-সূৰ্য-যেখানেই যা কিছু সৌন্দর্য ও কল্যাণ রয়েছে, তা তাদের কারো নিজস্ব নয়, সবই আল্লাহ্র দান। অতএব এসব কারণে যা কিছু প্রশংসা হতে পারে তা সবই আল্লাহ্র প্রাপ্য। এসব সৃষ্টি করার ব্যাপারে যেহেতু আল্লাহ্র সাথে কেউ শরীক ছিলনা, কাজেই এসব কারণে যে প্রশংসা প্রাপ্য হতে পারে তাতেও আল্লাহ্র সাথে কারো এক বিন্দু অংশীদারিত্ব থাকতে পারে না। সুন্দর, অনুগ্রহকারী, সৃষ্টিকর্তা, লালন-পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা ও ক্রমবিকাশদাতা আল্লাহ্র প্রতি মানুষ যা কিছু ভক্তি-শ্রদ্ধা ইবাদত-বন্দেগী এবং আনুগত্য পেশ করতে পারে; তা সবই একমাত্র আল্লাহ্র সামনেই নিবেদন করতে হবে। কেননা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোনো শক্তিই তার এক বিন্দুরও দাবীদার হতে পারে না। বরং তারই রয়েছে যাবতীয় হাম্দ। হাম্দ জাতীয় সবকিছু কেবল তাঁরই প্রাপ্য, কেবল তিনিই সেটার একমাত্র যোগ্য। তাছাড়া ভালো বা মন্দ সকল অবস্থায় কেবল এক সত্তারই ‘হামদ’ বা প্রশংসা করতে হয়। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ্ তা'আলা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন যে, কেউ যদি কোনো খারাপ কিছুর সম্মুখীন হয়, তখনও যেন বলে, اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ عَلٰى كُلِّ حَالٍ বা সর্বাবস্থায় আল্লাহ্র জন্যই যাবতীয় হামদ। [ইবন মাজাহ ৩৮০৩ ] কুরআন হাদীস হতে সুস্পষ্টরূপে জানা যায় যে, সাধারণভাবে কোনো ব্যক্তির গুণ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তার এতখানি প্রশংসাও করা যায় না যাতে তার ব্যক্তিত্বকেই অসাধারণভাবে বড় করে তোলা হয় এবং সে আল্লাহ্র সমকক্ষতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। মূলতঃ এইরূপ প্রশংসাই মানুষকে তাদের পূজার কঠিন পাপে নিমজ্জিত করে। সে জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তিকে বলেছেন: “যখন বেশী বেশী প্রশংসাকারীদেরকে দেখবে, তখন তাদের মুখের উপর ধূলি নিক্ষেপ কর। ” [মুসলিম ৩০০২] নতুবা তার মনে গৌরব ও অহংকারী ভাবধারার উদ্রেক হতে পারে। হয়ত মনে করতে পারে যে, সে বহুবিধ গুণ-গরিমার অধিকারী, তার বিরাট যোগ্যতা ও ক্ষমতা আছে। আর কোনো মানুষ যখন এই ধরনের খেয়াল নিজের মনে স্থান দেয় তখন তার পতন হতে শুরু হয় এবং সে পতন হতে উদ্ধার হওয়া কিছুতেই সম্ভব হয় না। তাছাড়া মানুষ যখন আল্লাহ্ ছাড়া অপর কারো গুণ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তার প্রশংসা করতে শুরু করে, তখন মানুষ তার ভক্তি-শ্রদ্ধার জালে বন্দী হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সে মানুষের দাসত্ব ও মানুষের পূজা করতে আরম্ভ করে। এই অবস্থা মানুষকে শেষ পর্যন্ত চরম পঙ্কিল শির্কের পথে পরিচালিত করতে পারে। সে জন্যই যাবতীয় ‘হামদ’ একমাত্র আল্লাহ্র জন্যই করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। [৩] ‘আলামীন' বহুবচন শব্দ, একবচনে ‘আলাম’। কোনো কোনো তাফসীরকার বলেন, ‘আলাম’ বলা হয় সেই জিনিসকে, যা অপর কোনো জিনিস সম্পর্কে জানার মাধ্যম হয়; যার দ্বারা অন্য কোনো বৃহত্তর জিনিস জানতে পারা যায়। সৃষ্টিজগতের প্রত্যেকটি অংশ স্বতঃই এমন এক মহান সত্তার অস্তিত্বের নিদর্শন, যিনি তার সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা, পৃষ্ঠপোষক ও সুব্যবস্থাপক। এই জন্য সৃষ্টিজগতকে ‘আলাম’ এবং বহুবচনে ‘আলামীন’ বলা হয়। [কাশশাফ] ‘আলামীন' বলতে কি বুঝায়, যদিও এখানে তার ব্যাখ্যা করা হয় নি, কিন্তু অপর আয়াতে তা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে। আয়াতটি হচ্ছে, (قَالَ فِرْعَوْنُ وَمَا رَبُّ الْعٰلَمِيْنَ ـ قَالَ رَبُّ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا اِنْ كُنْتُمْ مُّوْقِنِيْنَ) “ফির‘আউন বলল, রাব্বুল আলামীন কি? মূসা বললেন, যিনি আসমান-যমীন এবং এ দু'টির মধ্যবর্তী সমস্ত জিনিসের রব। " [সূরা আশ-শু'আরা ২৩-২৪] এতে ‘আলামীন' এর তাফসীর হয়ে গেছে যে, সৃষ্টি জগতের আর সব কিছুই এর অধীন। আসমান ও যমীনে এত অসংখ্য ‘আলাম’ বিদ্যমান যে, মানুষ আজ পর্যন্ত সেগুলোর কোনো সীমা নির্ধারণ করতে সমর্থ হয় নি। মানব-জগত, পশু-জগত, উদ্ভিদ-জগত-এই জগতসমূহের কোনো সীমা-সংখ্যা নেই, বরং এগুলো অসীম অতলস্পর্শ জগত-সমুদ্রের কয়েকটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু মাত্র। মানব-বুদ্ধি সে সম্পর্কে সঠিক ধারণা করতে একেবারেই সমর্থ নয়। [কুরতুবী, ফাতহুল কাদীর] [৪] 'রব্ব্’ শব্দের বাংলা অর্থ করা হয় প্রভু-লালন পালনকারী। কিন্তু কুরআনে প্রয়োগভেদে এ শব্দের অর্থ সৃষ্টি করা, সমানভাবে সজ্জিত ও স্থাপিত করা, প্রত্যেকটি জিনিসের পরিমাণ নির্ধারণ করা, পথ প্রদর্শন ও আইন বিধান দেওয়া, কোনো জিনিসের মালিক হওয়া, লালন-পালন করা, রিযিক্ দান করা ও উচ্চতর ক্ষমতার অধিকারী হওয়া। তাছাড়া ভাঙ্গা গড়ার অধিকারী হওয়া, জীবনদান করা, মৃত্যু প্রদান করা, সন্তান দেয়া, আরোগ্য প্রদান করা ইত্যাদি যাবতীয় অর্থই এতে নিহিত আছে। আর যিনি এক সঙ্গে এসব কিছু করার ক্ষমতা রাখেন তিনিই হচ্ছেন রব্। যেমন, পবিত্র কুরআনের সূরা আল-‘আলায় এইরূপ ব্যাপক অর্থে রব্ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْاَعْلَى ـ الَّذِيْ خَلَقَ فَسَوّٰى ـ وَالَّذِيْ قَدَّرَ فَهَدٰى) “আপনার রব্ এর নামে তাসবিহ্ পাঠ করুন, যিনি মহান উচ্চ; যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ও তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যথাযথ ভাবে সজ্জিত ও সুবিন্যস্ত করে দিয়েছেন; এবং যিনি সঠিক রূপে প্রত্যেকটি জিনিসের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। অতঃপর জীবন- যাপন পন্থা প্রদর্শন করেছেন।” [সূরা আল-‘আলা ১-৩] এই আয়াত থেকে নিঃসন্দেহে জানা যায় যে, ‘রব্’ তাঁকেই বলতে হবে যাঁর মধ্যে নিজস্ব ক্ষমতা বলে সৃষ্টি করার, সৃষ্টির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমান ও সজ্জিত করার, প্রত্যেকটির পরিমাণ নির্ধারণ করার এবং হিদায়াত, দীন ও শরী‘আত প্রদান করার যোগ্যতা রয়েছে। যিনি নিজ সত্তার গুণে মানুষ ও সমগ্র বিশ্ব-ভূবনকে সৃষ্টি করেছেন; শুধু সৃষ্টিই নয়-যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ ক্ষমতা দান করেছেন ও তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পরস্পরের সহিত এমনভাবে সংযুক্ত করে সাজিয়ে দিয়েছেন যে, তার প্রত্যেকটি অঙ্গই পূর্ণ সামঞ্জস্য সহকারে নিজ নিজ স্থানে বসে গেছে। রব্ তিনিই—যিনি প্রত্যেকটি জিনিসকেই কর্মক্ষমতা দিয়েছেন, সেই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট কাজ ও দায়িত্বও দিয়েছেন। প্রত্যেকের জন্য নিজের একটি ক্ষেত্র এবং তার সীমা নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেন, (الَّذِيْ لَهٗ مُلْكُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَّلَمْ يَكُنْ لَّهُ شَرِيْكٌ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهٗ تَقْدِيْرًا) “যিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন এবং তার পরিমাণ ঠিক করেছেন।" [সূরা আল-ফুরকান ২] অতএব এক ব্যক্তি যখন আল্লাহ্কে রব্ বলে স্বীকার করে, তখন সে প্রকারান্তরে এ কথারই ঘোষণা করে যে, আমার বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ দৈহিক, আধ্যাত্মিক, দীনি ও বৈষয়িক-যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করার দায়িত্ব ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই গ্রহণ করেছেন। আমার এই সবকিছু একমাত্র তাঁরই মর্জির উপর নির্ভরশীল। আমার সবকিছুর একচ্ছত্র মালিক তিনিই। আর কেউ তার কোনো কিছু পূরণ করার অধিকারী নয়। বস্তুতঃ সৃষ্টিলোকে আল্লাহ্র দু'ধরনের রুবুবিয়্যাত কার্যকর দেখা যায়: সাধারণ রুবুবিয়্যাত বা প্রকৃতিগত এবং বিশেষ রুবুবিয়াত বা শরী’আতগত। ১. প্রকৃতিগত বা সৃষ্টিমূলক- মানুষের জন্ম, তাহার লালন পালন ও ক্রমবিকাশ দান, তার শরীরকে ক্ষুদ্র হতে বিরাটত্বের দিকে, অসম্পূর্ণতা হতে পূর্ণতার দিকে অগ্রসর করা এবং তার মানসিক ক্রমবিকাশ ও উৎকর্ষতা দান। ২. শরী‘আত ভিত্তিক-মানুষের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রকে পথ প্রদর্শন করা, ভাল-মন্দ, পাপ-পুণ্য নির্দেশের জন্য নবী ও রাসূল প্রেরণ। যারা মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রতিভার পূর্ণত্ব বিধান করেন। এদেরই মাধ্যমে তারা হালাল, হারাম ইত্যাদি সম্পর্কে অবহিত হয়। নিষিদ্ধ কাজ হতে দূরে থাকতে এবং কল্যাণ ও মঙ্গলময় পথের সন্ধান লাভ করতে পারে। অতএব, আল্লাহ্ তা'আলার জন্য মানুষের রব্ হওয়ার ব্যাপারটি খুবই ব্যাপক। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা মানুষের রব্ হওয়া কেবল এই জন্যই নয় যে, তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তার দেহের লালন-পালন করেছেন এবং তার দৈহিক শৃঙ্খলাকে স্থাপন করেছেন। বরং এজন্যও তিনি রব্ যে, তিনি মানুষকে আল্লাহ্র বিধান মুতাবিক জীবন-যাপনের সুযোগদানের জন্য নবী প্রেরণ করেছেন এবং নবীর মাধ্যমে সেই ইলাহী বিধান দান করেছেন।
১:৩ [১] ‘রহমান-রাহীম' শব্দদ্বয়ের কারণে মূল আয়াতের অর্থ এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ্ তা'আলাই সমস্ত এবং সকল প্রকার প্রশংসার একচ্ছত্র অধিকারী কেবল এই জন্য নয় যে, তিনি রববুল ‘আলামীন, বরং এই জন্যও যে, তিনি ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহীম’। বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহ্ তা'আলার অপার অসীম দয়া ও অনুগ্রহ প্রতিনিয়ত পরিবেশিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক জগতে এই যে নিঃসীম শান্তি-শৃংখলা ও সামঞ্জস্য-সুবিন্যাস বিরাজিত রয়েছে, এর একমাত্র কারণ এই যে, আল্লাহ্র রহমত সাধারণভাবে সব কিছুর উপর অজস্র ধারায় বর্ষিত হয়েছে। সকল শ্রেণীর সৃষ্টিই আল্লাহ্র অনুগ্রহ লাভ করেছে। কাফির, মুশরিক, আল্লাহ্দ্রোহী, নাস্তিক, মুনাফিক, কাউকেও আল্লাহ্ তার রহমত হতে জীবন-জীবিকা ও সাধারণ নিয়মে বৈষয়িক উন্নতি কোন কিছু থেকেই– বঞ্চিত করেন নি। এমন কি, আল্লাহ্র অবাধ্যতা এবং তাঁর বিরোধিতা করতে চাইলেও আল্লাহ্ নিজ থেকে কাউকেও বাধা প্রদান করেন নি; বরং তিনি মানুষকে একটি সীমার মধ্যে যা ইচ্ছে তা করারই সুযোগ দিয়েছেন। এই জড় দুনিয়ার ব্যাপারে এটাই আল্লাহ্র নিয়ম। এই জন্যই আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করেছেন, “আর আমার রহমত সব কিছুকেই ব্যাপ্ত করে আছে। " [সূরা আল-আরাফ: ১৫৬] কিন্তু এই জড় জগত চূড়ান্তভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার পর যে নতুন জগত স্থাপিত হবে, তা হবে নৈতিক নিয়মের বুনিয়াদে স্থাপিত এক আলাদা জগত। সেখানে আল্লাহ্র দয়া অনুকম্পা আজকের মত সর্বসাধারণের প্রাপ্য হবে না। তখন আল্লাহ্র রহমত পাবে কেবল তারাই যারা আজকের দুনিয়ায় আখেরাতের রহমত পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সঠিক কর্মপন্থা গ্রহণ করেছে। ‘রাববুল আলামীন' বলার পর ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহীম’ শব্দদ্বয় উল্লেখ করায় এই কথাই সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এ বিশ্ব লোকের লালন-পালন, রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্রমবিকাশ দানের যে সুষ্ঠু ও নিখুঁত ব্যবস্থা আল্লাহ্ তা'আলা করেছেন, তার মূল কারণ সৃষ্টির প্রতি তাঁর অপরিসীম দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছুই নয়। অনুরূপভাবে ‘রাহমান’ এর পর ‘রাহীম' উল্লেখ করে আল্লাহ্ তা'আলা এই কথাই বলতে চান যে, দুনিয়াতে আল্লাহ্র নিরপেক্ষ ও সাধারণ রহমত লাভ করে কেউ যেন অতিরিক্ত মাত্রায় মেতে না যায় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর দেয়া দীনকে ভুলে না বসে। কেননা দুনিয়ার জীবনের পর আরও একটি জগত, আরও একটি জীবন নিশ্চিতরূপে রয়েছে, যখন আল্লাহ্র রহমত নির্বিশেষে আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্যই নির্দিষ্ট হবে। আর প্রকৃতপক্ষে তাদের জীবনই হবে সর্বোতভাবে সাফল্যমণ্ডিত।
১:৪ [১] এখানে আল্লাহ্কে ‘বিচার দিনের মালিক’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এই দিনের প্রকৃত রূপটি যে কি এবং জনগণের সম্মুখে এই দিন কি অবস্থা দেখা দিবে তা এখানে প্রকাশ করে বলা হয় নি। অন্যত্র তা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, (وَمَآ اَدْرٰىكَ مَا يَوْمُ الدِّيْنِ ـ ثُمَّ مَآ اَدْرٰىكَ مَا يَوْمُ الدِّيْنِ ـ يَوْمَ لَا تَمْلِكُ نَفْسٌ لِّنَفْسٍ شَـيْــــًٔا وَالْاَمْرُ يَوْمَىِٕذٍ لِّلّٰهِ) “বিচারের দিনটি কি, তা কিসে আপনাকে জানাবে? আবার জিজ্ঞাসা করি, কিসে আপনাকে জানাবে বিচারের দিনটি কি? তা এমন একটি দিন, যে দিন কেউই নিজের রক্ষার জন্য কোনোই সাহায্যকারী পাবে না, এবং সমগ্র ব্যাপার নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহ্র ইখতিয়ারভুক্ত হবে।" [সূরা আল-ইনফিতার: ১৭-১৯] আর (يَوْمُ الدِّيْنِ) বলিতে যে বিচারের দিন, প্রতিফল-তথা শাস্তি বা পুরষ্কারদানের দিন বুঝায়, তা অন্য আয়াতাংশে স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে, (يَوْمَىِٕذٍ يُّوَفِّيْهِمُ اللّٰهُ دِيْنَهُمُ الْحَقَّ), "আজকের দিনে আল্লাহ্ লোকদের প্রকৃত কর্মফল পূর্ণ করে দিবেন।" [সূরা আন-নূর: ২৫] মোটকথা, আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করছেন, তিনি কেবল ‘রাববুল ‘আলামীন, আর-রাহমান ও আর-রাহীমই নন, তিনি ‘মালিকি ইয়াওমিদিন'-ও। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা কেবল এই জীবনের লালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই এই বিরাট জগত-কারখানা স্থাপন করেন নি, এর একটি চূড়ান্ত পরিণতিও তিনি নির্ধারিত করেছেন। অর্থাৎ তোমরা কেউ মনে করো না যে, এই জীবনের অন্তরালে কোনো জীবন নেই। এই ধারণাও মনে স্থান দিও না যে, সেদিনও তোমাদের তেমনি স্বেচ্ছাচারিতা চলবে যেমন আজ চলছে বলে তোমরা ধারণা করছ; বরং সে দিন নিরঙ্কুশভাবে এক আল্লাহ্রই একচ্ছত্র কর্তৃত্ব, প্রভুত্ব ও মালিকানা পূর্ণমাত্রায় কার্যকর থাকবে। আজ যেমন তোমরা নিজেদের ইচ্ছামত কাজ করতে পারছ-অন্ততঃ এর পথে প্রাকৃতিক দিক দিয়ে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয় না, সে চূড়ান্ত বিচার দিনে কিন্তু তা কিছু মাত্র চলবে না। সেদিন কেবল আল্লাহ্র মর্জি কার্যকর হবে। আজ যেমন লোকেরা সত্যের প্রচণ্ড বিরোধিতা করে সুস্পষ্ট অন্যায় ও মারাত্মক যুলুম করেও সুনাম সুখ্যাতিসহ জীবন-যাপন করতে পারছে, সেদিন কিন্তু এসব ধোঁকাবাজী এক বিন্দুও চলবে না। বিচার দিবসের গুরুগম্ভীর পরিবেশ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সামান্য আন্দাজ করা যায় এই কথা হতে যে, বিচারের দিন জিজ্ঞেস করা হবে, “আজকের দিনে একচ্ছত্র কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব কার?” তার উত্তরে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হবে, “তা সবই একমাত্র সার্বভৌম ও শক্তিমান আল্লাহ্র জন্য নির্দিষ্ট।" [সূরা আল-গাফির: ৫৯], অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “এটা সে দিনের কথা যেদিন কোনো লোকই অন্য কারও জন্য কিছু করতে সক্ষম হবে না। সে দিন সমস্ত কর্তৃত্বই হবে একমাত্র আল্লাহ্র জন্য।" [সূরা আল-ইনফিতার: ১৯], আল্লাহ্র এই নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব কার্যকর হবে প্রথম সিংগায় ফুঁক দেয়ার দিন হতেই। বলা হয়েছে, "আর তাঁর নিরঙ্কুশ মালিকানা কার্যকর হবে সিংগায় ফুঁক দেয়ার দিনই।" [সূরা আল-আন’আম: ৭৩]
১:৫ [১] ‘ইবাদাত কথাটি শ্রবণের সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটি কথা মনের পটে জাগ্রত হয়। প্রথম এই যে, যে বন্দেগী স্বীকার করছে সে বান্দাহ ছাড়া আর কিছুই নয়, বান্দাহ হওয়া ও বান্দাহ হয়ে থাকাই তার সঠিক মর্যাদা। দ্বিতীয় এই যে, এমন একজন আছেন যাঁর বন্দেগী করা হচ্ছে, যাঁর বান্দাহ হয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে। তৃতীয়, যাঁর বন্দেগী করা হচ্ছে, তাঁর তরফ হতে নিয়ম ও বিধি-বিধান নাযিল হচ্ছে এবং যে বন্দেগী করছে, সে তাঁকে স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিধানকেও পরোপুরি মেনে নিচ্ছে। আর চতুর্থ এই যে, কাকেও মা‘বুদ বলে স্বীকার করা এবং তাঁর দেয়া বিধি-বিধান পালন করে চলার একটি অনিবার্য ফলাফল রয়েছে, যে ফলাফলের দিকে লক্ষ্য রেখেই এ বন্দেগীর কাজ করা হচ্ছে। ‘ইবাদাত-বন্দেগী করা; আনুগত্য করা; আদেশ নিষেধ মেনে চলা এবং বান্দাহ হয়ে থাকা, বান্দাহ্ হওয়ার লক্ষ্য-এ কথা কয়টি অবশ্যই স্পষ্ট হতে হয়। মূলতঃ ‘ইবাদাত শব্দের অর্থে আরও গভীরভাবে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। ‘ইবাদাত ও উবুদিয়াত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, الذلة বা অবনতি স্বীকার, দলিত মথিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা। পরিভাষায়, এ শব্দটি দ্বারা যদি فعل العابد ‘দাসের কাজ’ বা ‘কীভাবে দাস তার দাসত্ব বা ‘ইবাাদত করবে’ সেটা উদ্দেশ্য হয় তখন এর সংজ্ঞা হচ্ছে ما يجمع كمال المحبة والخضوع والخوف “এমন কোনোকিছুর নাম যাতে পরিপুর্ণ ভালোবাসা, বিনয় ও ভীতি এসব কয়টি ভাবধারা সমন্বিতভাবে পাওয়া যায়।” [ইবন কাসীর] পক্ষান্তরে যদি ‘ইবাদাত বলতে المتعبد به ‘কিসের শাধ্যমে ‘ইবাদাত করতে হবে’ সেটা উদ্দেশ্য হয়, তখন তার সংজ্ঞা হচ্ছে, اسم جامع لكل ما يحبه الله ويرضاه من الأقوال والأفعال الظاهرة والباطنة “আল্লাহ যা পছন্দ করেন ও ভালোবাসেন এমন প্রতিটি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা-কাজের নাম হচ্ছে ‘ইবাদাত।” [মাজমু‘ ফাতাওয়া] সুতরং কোনো কিছু আল্লাহর দরবারে ‘ইবাদাত হিসেবে কবুল হওয়ার জন্য দু’টি শর্ত অবশ্যই থাকবে। প্রথমত: সেটা একমাত্র আল্লাহ্র উদ্দেশ্যেই হতে হবে। তাতে থাকবে পরিপর্ণ ভালোবাসা, বিনয় ও ভীতি। যাকে ‘ইখলাস’ বলা হয়। দ্বিতীয়ত: সেটা হতে হবে রাসূলের প্রদর্শিত পদ্ধতিতে। প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কোনো কথা ও কাজ আল্লাহ্র কাছে প্রিয় ও কোনটি তিনি পছন্দ করেন সেটা একমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমেই আমরা লাভ করেছি। সুতরাং কোনো কাজ ‘ইবাদাত হিসেবে পরিগণিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় এ শর্তটি অবশ্যই পাওয়া যেতে হবে। মূলতঃ এ আয়াতটুকুতে ইসলামের মূল কথা কালেমা لاإله إلا الله-র তত্ত্বমূলক অর্থ প্রকাশ করা হয়েছে। এক কথায় আয়াতের অর্থ ‘ইবাদাত’ কেবল আল্লাহরই করব, মা‘বুদ কেবল তাঁকেই বানাব, তিনি ছাড়া আর কারও দাসত্ব কবুল করব না। [আদওয়াউল বায়ান] [২] আল্লাহ তা‘আলার পূর্বোল্লিখিত গুণাবলীর প্রতি যাদের ঈমান স্থাপিত হয়, যারা আল্লাহকেই একমাত্র ইলাহ, সৃষ্টিজগতের একচ্ছত্র রব্ব্, আর-রহমান, আর-রাহীম ও বিচার দিনের অপ্রতিদ্বন্দ্বী অধিপতি বলে মেনে নেয়, তাদের পক্ষে সেই আল্লাহর পরিপূর্ণ দাসত্ব কবুল করা-কেবল তাঁরই ‘ইবাদাত, আনুগত্য ও আদেশ পালন করা ছাড়া যেমন কোনো উপায়ই থাকতে পারে না, তেমনি এটা ব্যতীত তাদের জীবনের আর কোনো কাজ বা উদ্দেশ্যেই থাকতে পারে না। মূলতঃ সে উদ্দেশ্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ঘোষণা করেছেন, “মানুষ ও জিন জাতিকে এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি যে তারা (স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে) কেবল আমারই দাসত্ব ও বন্দেগী করবে।” [সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬] অর্থাৎ আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য করাই হচ্ছে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য। মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য লক্ষ্য আল্লাহর দাসত্ব এবং আনুগত্য করা ছাড়া আর কিছুই নেই-হতে পারে না। একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব স্বীকার করার অর্থ, মানুষ নিজেকে একমাত্র আল্লাহর মালিকানাধীন সত্তা স্বীকার করবে ও নিজেকে তাঁর খাঁটি দাস বানিয়ে নিবে। অতএব, মানুষ নিজে মা‘বুদ বা পূজ্য-উপাস্য-আরাধ্য ও সার্বভৌম হতে পারে না, এ অধিকার একমাত্র আল্লাহর। মানুষ যদি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো সত্তার পূজা-উপাসনা করে, মূল সৃষ্টিকাকার্যে কিংবা বিশ্ব-পরিচালনা রিযিকদান ও সৃস্টির হিফাযতের ব্যাপারে আল্লাহ ছাড়া বা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো শক্তিকে স্বীকার করে, তবে তা আাকীদা ও বিশ্বাসের দিক দিয়ে সুস্পষ্টরূপে শির্ক হবে। পক্ষান্তরে এসব দিক দিয়ে একমাত্র আল্লাহকে স্বীকার করলেও মানুষের বাস্তব জীবন ক্ষেত্রে ও সার্বভৌম শক্তি প্রয়েগেরা ক্ষেত্রে যদি মেনে নেয়া হয় আল্লাহ ছাড়া অপর কোনো শক্তিকে-কোনো পীর-আলেম, কোনো নেতা, সমাজপতি, কোনো বিচারক ও রাষ্ট্র-প্রদানকে, তবে তাতেও অনুরূপভাবে শির্ক হবে, আল্লাহর ‘ইবাদাত কিছুমাত্র আদায় হবে না। কেননা মানুষকে যে ‘ইবাদাতের উদ্দেশ্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তা কেবল হৃদয়গত বিশ্বাস ও ‘ইবাদতা-বন্দেগীর অনুষ্ঠান দ্বারাই হাসিল হতে পারে না; কারণ কেবল এর নাম ‘ইবাদাত নয়।ইবাদাতের কাজে বিশ্বাস করা ও মেনে নেয়ার সাথে সাথে ‘ইবাদাত-বন্দেগীর পরও বাস্তব আনুগত্য ও অনুসরণ করার ব্যাপারটিও পুরোপুরি রয়েছে। কাজেই এর একাংশের কাজ আদায় করলে তাতে আল্লাহর উদ্দেশ্য হাসিল হতে পারে না। এরূপ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সম্মুখে কঠিন প্রশ্নটি উপস্থাপিত হবে, “তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের একাংশে ঈমান আনো আর অপর অংশে কর কুপরী? অতঃপর তোমাদের মধ্যে থেকে যারাই এরূপ করবে, তাদের একমাত্র শাস্তি তো এই যে, দুনিয়ার জীবনে তাদের অপরিসীম লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা হবে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিনতম আযাবের দিকে নিক্ষেপ করা হবে। আর আল্লাহ তোমাদরে কাজকর্ম সম্পর্কে বাস্তবিকই বে-খবর নন।” [৩] মানুষ স্বভাবতই দুর্বল। তার ক্ষমতা বিভিন্ন দিকে যত বেশিই হোক না কেন, তা সীমাবদ্ধ। অসীম ক্ষমতা কোনো মাুষেরই নেই, মানুষ তার দাবিও করতে পারে না। সে জন্য প্রত্যেক মানুষই কোনো অসীম ক্ষমতা-সম্পন্ন সত্তার আশ্রয় নিতে, তাঁর মর্জির নিকট নিজেকে একান্তভাবে সোপর্দ করে দিতে বাধ্য হয়। এরূপ শক্তির আঁধার হিসেবে যারা আল্লাহকে স্বীকার করে, তারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার ও অন্য শক্তির অস্বীকারকারী; পক্ষান্তরে যারা আল্লাহকে স্বীকার করে না, স্বীকার করে কোনো দেব-দেবী, কোনো মৃত বা জীবিত পীর-বুজর্গ কিংবা কোনো রাষ্ট শক্তি বা কোনো বিভাগীয় প্রধানকে, তারা তাদের প্রিত ঈমানদার; আর আল্লাহর প্রতি কাফির। দুনিয়ার বিপদ-আপদ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য বৈষয়িক ক্ষেত্রে সঠিক উন্নতি লাভ করার উদ্দেশ্য উল্লিখিত প্রত্যেক ‘ঈমানদার’ ব্যক্তিরা তাদের ‘মা‘বুদের’ নিকট আশ্রয় ও সাহায্য প্রার্থনা করতে বাধ্য। তাদের মনস্তাত্বিক অবস্থার দিক দিয়ে এটা যেমন সত্য, তেমনি সত্য বাস্তব দিক দিয়েও। এরূপ সাহায্য ও আশ্রয় আল্লাহ ব্যতীত মানুষ বিপদ হতে উদ্ধার পেতে পারে না। মানুষ যখন নিজের অক্ষমতা ও অসহায়তা তীব্রভাবে অনুভব করে। মনের ঐকান্তিক তাগীদেই সে এক মবানুভব অসীম শক্তির সমীপে আত্মনিবেদিত হতে ও তাঁর প্রত্যক্ষ সাহায্য প্রার্থনা করতে একান্তভাবেই বাধ্য হয়। তাই আল্লাহর বান্দাহ এখানে ঘোষণা করছে যে, যেহেতু আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ক মা‘বুদ কেউ নেই-থাকতে পারে না, সেজন্য আমি একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী কবূল করেছি। অন্যভাবে বলা যায়, প্রকৃত সাহায্য করার ও বিপদ-আপদে আশ্যয় দান করারও কোনো অধিকার এবং ক্ষমতা এক আল্লাহর ছাড়া আর কারও নেই। সেজন্য এ সাহায্য ও আশ্রয়-হে আল্লাহ তোমারই নিকট প্রার্থনা করছি এবং ঘোষণা করছি যে, এই দুনিয়ার যেখানে যেখানে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনা সত্তা সাহায্যকারী ও ‘আশ্রয়দাতা’ সেজে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের সবাই মিথ্যাবাদী ও ধোঁকাবাজ এবং যেসব লোক আল্লাহকে ত্যাগ করে অপর কোনো সত্তার নিকট সাহায্য ও আশ্রয় পাওয়ার আশায় তাদেরই পদতলে মাথা লুটাচ্ছে, তারা সব ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট। আপনার সাহায্য ব্যতীত আমি ‘ইবাদাতটুকও সঠিকভাবে করতে পারব না। আপনার সাহায্য পেলেই তবে আমি শয়তানের কবল থেকে মুক্ত থাকতে পারব। আপনার সাহায্যেই আমি আমার নফসের খারাপ আহ্বান থেকে মুক্ত থাকতে পারব। সুতরাং একমাত্র আপনার কাছেই সাাহয্য চাই আর কারও কাছে নয়। আল্লাহর ‘ইবাদত ও তাঁর সাহায্য গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণতঃ চার দলে বিভক্ত : তাদের একদল একমাত্র আল্লাহর ‘ইবাদাত করে এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চায়। তারা হচ্ছে প্রকৃত ঈমানদার। দ্বিতীয়ত দলটি একমাত্র ই‘বাদাত করে সত্য, কিন্তু আল্লাহর প্রদর্শিত পদ্ধতির সাহায্য গ্রহণের পাশাপাশি অন্য কিছুর সাহায্য গ্রহণ করে। তারা গোনাহগার উম্মাত। তৃতীয় দলটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুরও ইবাদাত করে থাকে। কিন্তু তারা আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়। এরা আরবের মুশরিকদের মতো। যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদের ‘ইবাদাত করে থাকে, কিন্তু তারা বিপদে পড়লে একমাত্র আল্লাহর সাাহয্য চায়। চতুর্থ দলটি এমন যারা আল্লাহর ‘ইবাদাতও করে না, তাঁর কাছে সাহায্যও চায় না। তারা হচ্ছে নাস্তিক, যিন্দীক। [মাদারিজুস সালেকীন]
১:৬ [১] স্নেহ ও করুণা এবং কল্যাণ কামনাসহ কাউকে মঙ্গলময় পথ দেখিয়ে দেয়া ও মনজিলে পৌঁছিয়ে দেয়াকে আরবী পরিভাষায় ‘হিদায়াত' বলে। ‘হিদায়াত’ শব্দটির দু’টি অর্থ। একটি পথ প্রদর্শন করা, আর দ্বিতীয়টি লক্ষ্য স্থলে পৌঁছিয়ে দেয়া। যেখানে এই শব্দের পর দুইটি object থাকবে (الى) থাকবে না, সেখানে এর অর্থ হবে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছিয়ে দেয়া। আর যেখানে এ শব্দের পর (الى) শব্দ আসবে, সেখানে অর্থ হবে পথ প্রদর্শন। যেমন আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন, (اِنَّكَ لَا تَهْدِيْ مَنْ اَحْبَبْتَ وَلٰكِنَّ اللّٰهَ يَهْدِيْ مَنْ يَّشَاءُ) “নিশ্চয় আপনি লক্ষ্যস্থলে—মনজিলে—পৌঁছিয়ে দিতে পারবেন না যাকে আপনি পৌঁছাতে চাইবেন। বরং আল্লাহ্ই লক্ষ্যস্থলে পৌছিয়ে দেন যাকে তিনি ইচ্ছা করেন।" [সূরা আল-কাসাস: ৫৬] এ আয়াতে হিদায়েত শব্দের পর (الى) ব্যবহৃত হয়নি বলে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছিয়ে দেয়া অর্থ হয়েছে এবং তা করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাধ্যায়ত্ত নয় বলে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে পথ প্রদর্শন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লামের সাধ্যায়ত্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, (وَاِنَّكَ لَـــتَهْدِيْ اِلٰى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ) “হে নবী! আর আপনি অবশ্যই সরল সঠিক দৃঢ় ঋজু পথ প্রদর্শন করেন।" [সূরা আশ-শূরা: ৫২] কিন্তু লক্ষ্যস্থলে পৌঁছিয়ে দেয়ার কাজ কেবল আল্লাহ্র জন্যই নির্দিষ্ট। তাই তিনি নিজেই ঘোষণা করেছেন, (وَّلَهَدَيْنٰهُمْ صِرَاطًا مُّسْتَقِيْمًا) “আর অবশ্যই আমরা তাদেরকে সরল সোজা সুদৃঢ় পথে পৌঁছিয়ে দিতাম।” [সূরা আন-নিসা: ৬৮] সূরা আল-ফাতিহা’র আলোচ্য আয়াতে হিদায়েত শব্দের পর (الى) শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। ফলে এর অর্থ হবে সোজা সুদৃঢ় পথে মনজিলের দিকে চালনা করা। অর্থাৎ যেখানে বান্দাহ্ আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা করে শুধু এতটুকু বলে না যে, হে আল্লাহ্! আপনি আমাদেরকে সোজা সুদৃঢ় পথের সন্ধান দিন। বরং বলে, 'হে আল্লাহ্, আপনি আমাদেরকে সরল সুদৃঢ় পথে চলবার তাওফীক দিয়ে মনজিলে পৌছিয়ে দিন। কেননা শুধু পথের সন্ধান পাইলেই যে সে পথ পাওয়া ও তাতে চলে মনজিলে পৌঁছা সম্ভবপর হবে তা নিশ্চিত নয়।’ কিন্তু ‘সিরাতে মুস্তাকীম’ কি? সিরাত শব্দের অর্থ হচ্ছে, রাস্তা বা পথ। আর মুস্তাকীম হচ্ছে, সরল সোজা। সে হিসেবে সিরাতে মুসতাকীম হচ্ছে, এমন পথ, যা একেবারে সোজা ও ঋজু, প্রশস্ত ও সুগম; যা পথিককে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছিয়ে দেয়; যে পথ দিয়ে লক্ষ্যস্থল অতি নিকটবতী এবং মনযিলে মাকছুদে পৌঁছার জন্য যা একমাত্র পথ, যে পথ ছাড়া লক্ষ্যে পৌছার অন্য কোনো পথই হতে পারে না। আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমারও রব তোমাদেরও রব, অতএব একমাত্র তারই দাস হয়ে থাক। এটাই হচ্ছে সিরাতুম মুস্তাকীম-সঠিক ও সুদৃঢ় ঋজু পথ।" [সূরা মারইয়াম: ৩৬] অর্থাৎ আল্লাহ্কে রব স্বীকার করে ও কেবল তাঁরই বান্দাহ্ হয়ে জীবন-যাপন করলেই সিরাতুম মুস্তাকীম অনুসরণ করা হবে। অন্যত্র ইসলামের জরুরী বিধি-বিধান বর্ণনা করার পর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, “আর এটাই আমার সঠিক দৃঢ় পথ। অতএব, তোমরা এই পথ অনুসরণ করে চল। এছাড়া আরও যত পথ আছে, তার একটিতেও পা দিও না; কেননা তা করলে সে পথগুলো তোমাদেরকে আল্লাহ্র পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দিবে-ভিন্ন দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন এ উদ্দেশ্যে, যেন তোমরা ধ্বংসের পথ হতে আত্মরক্ষা করতে পার।" [সূরা আল-‘আন আম: ১৫৩] একমাত্র আল্লাহ্র নিকট থেকে যে পথ ও বিধি-বিধান পাওয়া যাবে, তাই মানুষের জন্য সঠিক পথ। আল্লাহ্ বলেন, “প্রকৃত সত্য-সঠিক-ঋজু-সরল পথ প্রদর্শন করার দায়িত্ব আল্লাহ্র উপর, যদিও আরও অনেক বাঁকা পথও রয়েছে। আর আল্লাহ্ চাইলে তিনি সব মানুষকেই হিদায়াতের পথে পরিচালিত করতেন।” [সূরা আন-নাহল: ৯] সিরাতে মুস্তাকীমের তাফসীর কোনো কোনো মুফাসসির করেছেন, ইসলাম। আবার কারও কারও মতে, কুরআন। [আত-তাফসীরুস সহীহ] বস্তুতঃ আল্লাহ্র প্রদত্ত বিশ্বজনীন দীনের অন্তর্নিহিত প্রকৃত রূপ ‘সিরাতুল মুস্তাকীম' শব্দ হতে ফুটে উঠেছে। আল্লাহ্ তা'আলার দাসত্ব কবুল করে তারই বিধান অনুসারে জীবন-যাপন করার পথই হচ্ছে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম' এবং একমাত্র এই পথে চলার ফলেই মানুষ আল্লাহ্র নি‘আমত ও সন্তোষ লাভ করতে পারে। সে একমাত্র পথই মানব জীবনের প্রকৃত ও চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য একান্ত অপরিহার্য। তাই সে একমাত্র পথে চলার তাওফীক প্রার্থনা করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে এই আয়াতটিতে। কিন্তু আল্লাহ্র নিকট হতে এই পথ কিরূপে পাওয়া যেতে পারে? সে পথ ও পন্থা নির্দেশ করতে গিয়ে আল্লাহ্ এর তিনটি সুস্পষ্ট পরিচয় উল্লেখ করেছেন: ১. এই জীবন কিভাবে যাপন করতে হবে তা তাদের নিকট হতে গ্রহণ করতে হবে, যারা উক্ত বিধান অনুযায়ী জীবন-যাপন করে আল্লাহ্র নিকট হতে নি‘আমত ও অসীম অনুগ্রহ লাভ করেছে। ২. এই পথের পথিকদের উপর আল্লাহ্র গজব নাযিল হয় নি, অভিশপ্তও তারা নয়। ৩. তারা পথভ্রান্ত লক্ষ্যভ্রষ্টও নয়। পরবর্তী আয়াতসমূহে এ কথা কয়টির বিস্তারিত আলোচনা আসছে।
১:৭ [১] এটা আল্লাহ্র নির্ধারিত সঠিক ও দৃঢ় পথের প্রথম পরিচয়। এর অর্থ এই যে, আল্লাহ্র নিকট হতে যে পথ নাযিল হয়েছে, তা অনুসরণ করলে আল্লাহ্র রহমত ও নি‘আমত লাভ করা যায়। দ্বিতীয়তঃ তা এমন কোনো পথই নয়, যা আজ সম্পূর্ণ নতুনভাবে পেশ করা হচ্ছে- পূর্বে পেশ করা হয় নি। বরং তা অতিশয় আদিম ও চিরন্তন পথ। মানুষের এই কল্যাণের পথ অত্যন্ত পুরাতন, ততখানি পুরাতন যতখানি পুরাতন হচ্ছে স্বয়ং মানুষ। প্রথম মানুষ হতেই এটা মানুষের সম্মুখে পেশ করা হয়েছে, অসংখ্য মানুষ এ পথ প্রচার করেছেন, কবুল করার আহবান জানিয়েছেন, এটা বাস্তবায়িত করার জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত তারা আল্লাহ্র নিকট হতে, অপূর্ব নি‘আমত ও সম্মান লাভের অধিকারী প্রমাণিত হয়েছেন। এই নি‘আমত এই দুনিয়ার জীবনেও তারা পেয়েছেন, আর আখেরাতেও তা তাদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে রয়েছে। মূলতঃ আল্লাহ্র নি‘আমতপ্রাপ্ত লোকদের চলার পথ ও অনুসৃত জীবনই হচ্ছে বিশ্ব মানবতার জন্য একমাত্র পথ ও পন্থা। এতদ্ব্যতীত মানুষের পক্ষে গ্রহণযোগ্য, অনুসরণীয় ও কল্যাণকর পথ আর কিছুই হতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ্র অনুগ্রহপ্রাপ্ত লোক কারা এবং তাদের পথ বাস্তবিক পক্ষে কি? এর উত্তর অন্য আয়াতে এসেছে, “যা করতে তাদেরকে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তারা তা করলে তাদের ভালো হত এবং চিত্তস্থিরতায় তারা দৃঢ়তর হত। এবং তখন আমি আমার কাছ থেকে তাদেরকে নিশ্চয় মহাপুরস্কার প্রদান করতাম এবং তাদেরকে নিশ্চয় সরল পথে পরিচালিত করতাম। আর কেউ আল্লাহ্ এবং রাসুলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ (যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন) তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী! এগুলো আল্লাহ্র অনুগ্রহ। সর্বজ্ঞ হিসেবে আল্লাহ্ই যথেষ্ট।" [সূরা আন-নিসা: ৬৬-৭০] এ আয়াত থেকে সঠিক ও দৃঢ় জীবন পথ যে কোনটি আর আল্লাহ্র অনুগ্রহপ্রাপ্ত লোকগণ যে কোন পথে চলেছেন ও চলে আল্লাহ্র অনুগ্রহ পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন তা সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে জানা যায়। তারা হচ্ছেন আম্বিয়া, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহীন। [ইবন কাসীর] [২] এটা আল্লাহ্র নির্ধারিত ‘সিরাতুল মুস্তাকীম' এর দ্বিতীয় পরিচয়। আল্লাহ্ তা'আলা যে পথ মানুষের সম্মুখে চিরন্তন কল্যাণ লাভের জন্য উপস্থাপিত করেছেন সে পথ অভিশাপের পথ নয় এবং সে পথে যারা চলে তাদের উপর কখনই আল্লাহ্র অভিশাপ বর্ষিত হতে পারে না। সে পথ তো রহমতের পথ বরং সে পথের পথিকদের প্রতি দুনিয়াতে যেমন আল্লাহ্র অনুগ্রহ ও সাহায্য বর্ষিত হয়ে থাকে, আখেরাতেও তারা আল্লাহ্র চিরস্থায়ী সন্তোষ লাভের অধিকারী হবে। এই আয়াতাংশের অপর একটি অনুবাদ হচ্ছে, “তাদের পথ নয় যাদের উপর আল্লাহ্র অভিশাপ নাযিল হয়েছে।" এরূপ অনুবাদ করলে তাতে ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ ছাড়া আরও একটি পথের ইঙ্গিত মানুষের সামনে উপস্থাপিত হয়, যা আল্লাহ্র নিকট হতে অভিশপ্ত এবং সে পথ হতে মানুষকে রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য মনে হয়। কিন্তু এখানে আল্লাহ্ মূলতঃ একটি পথই উপস্থাপিত করেছেন এবং একটি পথেরই ইতিবাচক দু‘টি বিশেষণ দ্বারা সেটাকে অত্যধিক সুস্পষ্ট করে তুলেছেন। তাই অনেকেই পূর্বোক্ত প্রথম অনুবাদটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। উভয় অর্থের জন্য [দেখুন: যামাখশারী, ইবন কাসীর, ফাতহুল কাদীর] প্রথম অনুবাদ বা দ্বিতীয় অনুবাদ যাই হোক না কেন এখানে এ কথা স্পষ্ট হচ্ছে যে, আল্লাহ্র প্রতি ঈমানদার লোকদেরকে প্রকারান্তরে এমন পথ ও পন্থা গ্রহণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যা আল্লাহ্র অভিশাপের পথ, যে পথে চলে কোনো কোনো লোক অভিশপ্ত হয়েছে। কিন্তু সে অভিশপ্ত কারা, কারা কোন পথে চলে আল্লাহ্র নিকট হতে অভিশপ্ত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেয়া আবশ্যক। কুরআন মাজীদে ঐতিহাসিক জাতিদের সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বলা হয়েছে “আর তাদের উপর অপমান, লাঞ্ছনা ও দারিদ্র্যের কষাঘাত হানা হয়েছে এবং তারা আল্লাহ্র অভিশাপ প্রাপ্ত হয়েছে।" [সূরা আল-বাকারাহ: ৬১] পূর্বাপর আলোচনা করলে নিঃসন্দেহে এটা বুঝতে পারা যায় যে, এ কথাটি ইয়াহুদীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। তাই ‘মাগদুব’ বলতে যে এখানে ইয়াহুদীদের বুঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে সমস্ত মুফাস্সিরই একমত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসেও অনুরূপ স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। [দেখুন: মুসনাদে আহমাদ ৫/৩২,৩৩] [৩] এটি ‘সিরাতুল মুস্তাকীম'-এর তৃতীয় ও সর্বশেষ পরিচয়। অর্থাৎ যারা সিরাতুল মুস্তাকীম এ চলে আল্লাহ্র নি‘আমত লাভ করতে পেরেছেন তারা পথভ্রষ্ট নন-কোনো গোমরাহীর পথে তারা চলেন না। পূর্বোল্লেখিত আয়াতের ন্যায় এ আয়াতেরও অন্য অনুবাদ হচ্ছে, ‘তাদের পথে নয় যারা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে, যারা গোমরাহ হয়ে আল্লাহ্র উপস্থাপিত পথ হতে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস থেকে এ পথ ভ্ৰষ্ট লোকদের পরিচয় জানতে পারা যায় যে, দুনিয়ার ইতিহাসে নাসারাগণ হচ্ছে কুরআনে উল্লেখিত এ গোমরাহ ও পথ ভ্ৰষ্ট জাতি। [মুসনাদে আহমাদ ৫/৩২,৩৩, ৭৭] কোনো মুসলিম যখন সূরা ফাতিহা পাঠ করে, তখন সে প্রকারান্তরে এ কথাই ঘোষণা করে যে, “হে আল্লাহ্ আমরা স্বীকার করি, আপনার সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে যে জীবন-ধারা গড়ে উঠে তা-ই একমাত্র মুক্তির পথ। এজন্য আপনার নির্ধারিত এ পথে চলে যারা আপনার নি‘আমত পেয়েছেন সেই পথই একমাত্র সত্য ও কল্যাণের পথ, আল্লাহ্ সেই পথেই আমাদেরকে চলবার তাওফীক দিন। আর যাদের উপর আপনার অভিশাপ বর্ষিত হয়েছে ও যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তাদের যেন আমরা অনুসরণ না করি। কেননা সে পথে প্রকৃতই কোনো কল্যাণ নেই।" বস্তুতঃ কুরআনুল কারীম দুনিয়ার বর্তমান বিশ্বমানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ ও একমাত্র সর্বশেষ আল্লাহ্র দেয়া গ্রন্থ। এর উপস্থাপিত আদর্শ ও জীবন পথই হচ্ছে বিশ্বমানবতার একমাত্র স্থায়ী ও কল্যাণের পথ। এর বিপরীত সমস্ত জীবনাদর্শকে মিথ্যা প্রমাণ করে একমাত্র এরই উপস্থাপিত আদর্শের ভিত্তিতে নিজেদেরকে গঠন করা মুসলিমদের একমাত্র দায়িত্ব। মুসলিমরা আজও সেই দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ হলে সূরা আল-ফাতিহা তাদের জীবনে সার্থক হবে। মূলতঃ যারা সূরা আল-ফাতিহার অর্থ বুঝে তা পাঠ শেষ করার পর তাদের মন থেকে দো’আ করবে, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের দো’আ কবুল করবেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (اِذا قَالَ الْاِمَامُ غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ، فَقُوْلُوْ اٰمِيْنَ، فَمَنْ وَافَقَ قَوْلُهٗ قَوْلَ الْمَلَائِكَةِ غُفِرَ لَهٗ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِه) “যখন ইমাম ‘গাইরিল মাগদূবি ‘আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বল্লীন’ বলে তখন তোমরা ‘আমীন’ বা ‘হে আল্লাহ্ কবুল করুন’ এ কথাটি বল; কেননা যার কথাটি ফেরেশতাদের কথা অনুযায়ী হবে তার পূর্বেরগুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।" [বুখারী ৭৮২,মুসলিম ৪০৯l অন্য বর্ণনায় এসেছে, (وَاِذا قَالَ: غَيْرِ الْمَغْضُوْبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ، فَقُوْلُوْ اٰمِيْنَ، يُجِيْبُكمُ اللّٰهُ) “যখন ‘ইমাম গাইরিল মাগদূবি ‘আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বল্লীন’ বলে তখন তোমরা ‘আমীন’ বা ‘হে আল্লাহ্ কবুল করুন’ এ কথাটি বল; এতে আল্লাহ্ তোমাদের আহবানে সাড়া দিবেন (দো’আ কবুল করবেন)।" [মুসলিম ৪০৪] অন্য এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (مَا حَسَدَتْكُمْ اليَهُوْدُ عَلَى شَيئٍ مَا حَسَدَ تْكُمُ عَلَى السَّلَامِ وَالتَّأْمِيْنِ) “ইয়াহুদীরা তোমাদেরকে তোমাদের ‘সালাম’ ও ‘আমীন' বলার চেয়ে বেশী কোনো বিষয়ের উপর হিংসা করে না।” [ইবন মাজাহ ৮৫৬]
আরেকটি সূরা পড়ুন
প্রথম দুই রাকাতে সূরা আল-ফাতিহার পর যেকোনো সূরা বা কয়েকটি আয়াত পড়ুন। শুরু করার জন্য একটি ছোট সূরা হলো সূরা আল-ইখলাস:
قُلْ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ (1) ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ (2) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (3) وَلَمْ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدٌۢ (4)
কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুন লাহু কুফুওয়ান আহাদ।
বলুন [১] , ‘তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয় [২] , ‘আল্লাহ্ হচ্ছেন ‘সামাদ' [১] (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী); তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি [১] , ‘এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই [১]।’
টীকা
১১২:১ সূরা সম্পর্কিত তথ্য: ১১২- সূরা ইখলাস ৪ আয়াত, মক্কী এ সূরার বহু ফযীলত রয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নে কয়েকটির উল্লেখ করা হলো: এক. এর ভালবাসা জান্নাতে যাওয়ার কারণ; হাদীসে এসেছে, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে আরয করল: আমি এই সূরাটি খুব ভালবাসি। তিনি বললেন: এর ভালবাসা তোমাকে জান্নাতে দাখিল করবে। [মুসনাদে আহমাদ ৩/১৪১, ১৫০] দুই. এটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। হাদীসে এসেছে, একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমরা সবাই একত্রিত হয়ে যাও। আমি তোমাদেরকে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ শুনাব। অতঃপর যাদের পক্ষে সম্ভব ছিল, তারা একত্রিত হয়ে গেলে তিনি আগমন করলেন এবং সূরা এখলাস পাঠ করে শুনালেন। তিনি আরও বললেন, এই সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। [মুসলিম ৮১২, তিরমিয়ী ২৯০০] এ অর্থে হাদীসের সংখ্যা অসংখ্য। তিন. বিপদাপদে উপকারী। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সূরা এখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে তা তাকে বালা-মুসীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট হয়। [আবু দাউদ ৫০৮২, তিরমিয়ী ৩৫৭৫, নাসায়ী ৭৮৫২] চার. ঘুমানোর আগে পড়ার উপর গুরুত্ব। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, হে উকবা ইবন আমের আমি কি তোমাকে এমন তিনটি উত্তম সূরা শিক্ষা দিব না যার মত কিছু তাওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর এবং কুরআনেও নাযিল হয়নি। উকবা বললেন, আমি বললাম, অবশ্যই হ্যাঁ, আল্লাহ্ আমাকে আপনার জন্য উৎসর্গ করুন। উকবা বলেন, তারপর রাসূল আমাকে ‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ, কুল আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক, কুল আ‘উযু বিরাব্বিন নাস’ এ সূরাগুলো পড়ালেন, তারপর বললেন, হে উকবা! রাত্ৰিতে তুমি ততক্ষণ নিদ্রা যেয়ো না, যতক্ষণ সূরা এখলাস, ফালাক ও নাস না পাঠ কর। উকবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: সেদিন থেকে আমি কখনও এই আমল ছাড়িনি। [মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৮, ১৫৮-১৫৯] পাঁচ. এ সূরা পড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিয়মিত আমল ছিল। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন বিছানায় ঘুমানোর জন্য যেতেন তখন তিনি তার দু হাতের তালু একত্রিত করতেন তারপর সেখানে কুল হুয়াল্লাহু আহাদ, কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক এবং কুল আউযু বিরাব্বিন নাস’ এ তিন সূরা পড়ে ফুঁ দিতেন, তারপর এ দু’ হাতের তালু দিয়ে তার শরীরের যতটুকু সম্ভব মসেহ করতেন। তার মাথা ও মুখ থেকে শুরু করে শরীরের সামনের অংশে তা করতেন। এমনটি রাসূল তিনবার করতেন। [বুখারী ৫০১৭, আবু দাউদ ৫০৫৬, তিরমিয়ী ৩৪০২] ------------------ [১] বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে, মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ তা‘আলার বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, যার জওয়াবে এই সূরা নাযিল হয়। [তিরমিয়ী ৩৩৬৪, মুসনাদে আহমাদ ৫/১৩৪, মুস্তাদরাকে হাকিম ২/৫৪০] কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, মুশরিকরা আরও প্রশ্ন করেছিল- আল্লাহ্ তা‘আলা কিসের তৈরী, স্বর্ণরৌপ্য অথবা অন্য কিছুর? এর জওয়াবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে। [আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী ৬/৩৭০, তাবরানী, মু‘জামুল আওসাত ৩/৯৬, মুসনাদে আবি ইয়া‘লা ৬/১৮৩, নং-৩৪৬৮, আদ-দিনাওয়ারী, আল-মুজালাসা ও জাওয়াহিরুল ইলম ৩/৫২৮, নং ১১৪৫] এখানে ‘বলুন’ শব্দটির মাধ্যমে প্রথমত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে। কারণ, তাকেই প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার রব কে? তিনি কেমন? আবার তাকেই হুকুম দেয়া হয়েছিল, প্রশ্নের জবাবে আপনি একথা বলুন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তিরোধানের পর এ সম্বোধনটি প্রত্যেক মুমিনের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কথা বলার হুকুম দেয়া হয়েছিল এখন সে কথা প্রত্যেক মুমিনকেই বলতে হবে। [২] এ বাক্যটির অর্থ হচ্ছে, তিনি (যাঁর সম্পর্কে তোমরা প্রশ্ন করছো) আল্লাহ্, একক-অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো সমকক্ষ, সদৃশ, স্ত্রী, সন্তান, অংশীদার কিছুই নেই। একত্ব তাঁরই মাঝে নিহিত। তাই তিনি পূর্ণতার অধিকারী, অদ্বিতীয়-এক। সুন্দর নামসমূহ, পূর্ণ শ্রেষ্ঠ গুণাবলী এককভাবে শুধুমাত্র তাঁরই। [কুরতুবী, সা’দী] আর أحد শব্দটি একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কেননা তিনিই গুণাবলী ও কার্যাবলীতে একমাত্র পরিপূর্ণ সত্তা। [ইবন কাসীর] মোটকথা, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর সত্তা ও গুণাবলীতে একক, তার কোনো সমকক্ষ, শরীক নেই। এ সূরার শেষ আয়াত “আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই” দ্বারা তিনি এর ব্যাখ্যা করেছেন। মূলতঃ সমগ্র কুরআন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাত এমনকি সকল নবী-রাসূলদের রিসালাতের আগমন হয়েছিলো এ একত্ব ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠার জন্যই। আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো হক মাবুদ বা ইলাহ নেই- সমগ্র সৃষ্টিজগতেই রয়েছে এর পরিচয়, আল্লাহর একত্বের পরিচয়। কুরআনে অগণিত আয়াতে এ কথাটির প্রমাণ ও যুক্তি রয়েছে। [আদ্ওয়াউল বায়ান]
১১২:২ [১] صمد শব্দের অর্থ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের অনেক উক্তি আছে। আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, ইকরামা বলেছেন: সামাদ হচ্ছেন এমন এক সত্তা যাঁর কাছে সবাই তাদের প্রয়োজন পূরণের জন্য পেশ করে থাকে। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ও আবু ওয়ায়েল শাকীক ইবন সালামাহ বলেছেন, তিনি এমন সরদার, নেতা, যাঁর নেতৃত্ব পূর্ণতা লাভ করেছে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, যে সরদার তার নেতৃত্ব, মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব, ধৈর্য, সংযম, জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও বিচক্ষণতা তথা শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার সমস্ত গুণাবলিতে সম্পূর্ণ পূর্ণতার অধিকারী তিনি সামাদ। যায়েদ ইবন আসলাম বলেন, এর অর্থ, নেতা। হাসান ও কাতাদা বলেন, এর অর্থ, যিনি তার সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে গেলেও অবশিষ্ট থাকবেন। হাসান থেকে অন্য বর্ণনায়, তিনি ঐ সত্বা, যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক, যার কোনো পতন নেই। অন্য বর্ণনায় ইকরিমা বলেন, যার থেকে কোনো কিছু বের হয়নি এবং যিনি খাবার গ্রহণ করেন না। রবী ইবন আনাস বলেন, যিনি জন্মগ্ৰহণ করেননি এবং জন্ম দেননি। সম্ভবত তিনি পরবর্তী আয়াতকে এ আয়াতের তাফসীর হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তবে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব, মুজাহিদ, ইবন বুরাইদা, আতা, দাহহাক সহ আরো অনেকে এর অর্থ বলেছেন, যার কোনো উদর নেই। শা‘বী বলেন, এর অর্থ যিনি খাবার খান না এবং পানীয় গ্ৰহণ করেন না। আব্দুল্লাহ ইবন বুরাইদাহ বলেন, এর অর্থ, যিনি এমন আলো যা চকচক করে। এ বর্ণনাগুলো ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারী, ইবন আবী হাতেম, বাইহাকী, তাবারানী প্রমূখগণ সনদসহ বর্ণনা করেছেন। [দেখুন, তাবারী; ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] বস্তুতঃ উপরে বর্ণিত অর্থ গুলোর সবই নির্ভুল। এর মানে হচ্ছে, আসল ও প্রকৃত সামাদ হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ্। সৃষ্টি যদি কোনো দিক দিয়ে সামাদ হয়ে থাকে তাহলে অন্য দিক দিয়ে তা সামাদ নয় কারণ তা অবিনশ্বর নয় একদিন তার বিনাশ হবে। কোনো কোনো সৃষ্টি তার মুখাপেক্ষী হলেও সে নিজেও আবার কারো মুখাপেক্ষী। তার নেতৃত্ব আপেক্ষিক, নিরংকুশ নয়। কারো তুলনায় সে শ্রেষ্ঠতম হলেও তার তুলনায় আবার অন্য কেউ আছে শ্রেষ্ঠতম। কিছু সৃষ্টির কিছু প্রয়োজন সে পূর্ণ করতে পারে কিন্তু সবার সমস্ত প্রয়োজন পূর্ণ করার ক্ষমতা কোনো সৃষ্টির নেই। বিপরীতপক্ষে আল্লাহর সামাদ হওয়ার গুণ অর্থাৎ তার মুখাপেক্ষীহীনতার গুণ সবদিক দিয়েই পরিপূর্ণ। সারা দুনিয়া তাঁর মুখাপেক্ষী তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। দুনিয়ার প্রত্যেকটি জিনিস নিজের অস্তিত্ব, স্থায়ীত্ব এবং প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য সচেতন ও অবচেতনভাবে তাঁরই শরণাপন্ন হয়। তিনিই তাদের সবার প্রয়োজন পূর্ণ করেন। তিনি অমর, অজয়, অক্ষয়। তিনি রিযিক দেন, নেন না। সমগ্ৰ বিশ্ব জাহানের ওপর তাঁর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই তিনি “আস-সামাদ।” অর্থাৎ তিনিই একমাত্র সত্তা যিনি অমুখাপেক্ষিতার গুণাবলীর সাথে পুরোপুরি সংযুক্ত। আবার যেহেতু তিনি “আস-সামাদ” তাই তাঁর একাকী ও স্বজনবিহীন হওয়া অপরিহার্য। কারণ, এ ধরনের সত্তা একজনই হতে পারেন, যিনি কারো কাছে নিজের অভাব পূরণের জন্য হাত পাতেন না, বরং সবাই নিজেদের অভাব পূরণের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী হয়। দুই বা তার চেয়ে বেশী সত্তা সবার প্রতি অমুখাপেক্ষী ও অনির্ভরশীল এবং সবার প্রয়োজন পূরণকারী হতে পারে না। তাছাড়া তাঁর “আস-সামাদ” হওয়ার কারণে তাঁর একক মাবুদ হওয়ার ব্যাপারটিও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ, মানুষ যার মুখাপেক্ষী হয় তারই ইবাদাত করে। আবার তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, “আস-সামাদ” হওয়ার কারণে এটাও অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কারণ, যে প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষমতা ও সামর্থই রাখে না, কোনো সচেতন ব্যক্তি তার ইবাদাত করতে পারে না। এভাবে আমরা উপরোক্ত অর্থগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে পারি।
১১২:৩ [১] যারা আল্লাহর বংশ পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল, এটা তাদের জওয়াব। সন্তান প্ৰজনন সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য-স্রষ্টার নয়। অতএব, তিনি কারও সন্তান নন এবং তাঁর কোনো সন্তান নেই। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ্ বলেন, “আদম সন্তান আমার উপর মিথ্যারোপ করে অথচ এটা তার জন্য উচিত নয়। আর আমাকে গালি দেয়, এটাও তার জন্য উচিত নয়। তার মিথ্যারোপ হচ্ছে, সে বলে আমাকে যেভাবে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন সেভাবে তিনি কখনও আমাকে পুনরায় সৃষ্টি করবেন না। অথচ দ্বিতীয় সৃষ্টি প্রথম সৃষ্টির চেয়ে কোনোভাবেই কঠিন নয়। আর আমাকে গালি দেয়ার ব্যাপারটি হলো, সে বলে আল্লাহ্ সন্তান গ্ৰহণ করেছেন, অথচ আমি একক, সামাদ, জন্মগ্রহণ করিনি এবং কাউকে জন্মও দেইনি। আর কেউই আমার সমকক্ষ নেই।” [বুখারী ৪৯৭৪]
১১২:৪ [১] মূলে বলা হয়েছে ‘কুফু’ । এর মানে হচ্ছে, নজীর, সদৃশ, সমান, সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সমতুল্য। আয়াতের মানে হচ্ছে, সারা বিশ্ব-জাহানে আল্লাহর সমকক্ষ অথবা তাঁর সমমর্যাদাসম্পন্ন কিংবা নিজের গুণাবলী, কর্ম ও ক্ষমতার ব্যাপারে তাঁর সমান পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে এমন কেউ কোনো দিন ছিল না এবং কোনো দিন হতেও পারবে না এবং আকার-আকৃতিতেও কেউ তাঁর সাথে সামঞ্জস্য রাখে না। এক হাদীসে এসেছে, বুরাইদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন এক লোক সালাত আদায় করছে এবং বলছে اللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ بأَنِّيْ أَشْهَدُ أنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، الأَحَدُ الصَّمَدُ، الَّذِيْ لَم يَلِدْ وَلَمْ يُوْ لَدْ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ এটা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ করে বলছি, এ লোকটি আল্লাহ্কে তাঁর এমন মহান নামে ডাকল যার অসীলায় চাইলে তিনি প্রদান করেন। আর যার দ্বারা দো‘আ করলে তিনি কবুল করেন।” [আবু দাউদ ১৪৯৩, তিরমিয়ী ৩৪৭৫, ইবন মাজাহ ৩৮৫৭, মুসনাদে আহমাদ ৫/৩৫০] মুশরিকরা প্ৰতি যুগে মাবুদদের ব্যাপারে এ ধারণা পোষণ করে এসেছে যে, মানুষের মতো তাদেরও একটি জাতি বা শ্রেণী আছে। তার সদস্য সংখ্যাও অনেক। তাদের মধ্যে বিয়ে-শাদী এবং বংশ বিস্তারের কাজও চলে। তারা আল্লাহ্ রাব্ববুল আলামীনকেও এ জাহেলী ধারণা মুক্ত রাখেনি। তাঁর জন্য সন্তান সন্ততিও ঠিক করে নিয়েছে। তারা ফেরেশতাদেরকে মহান আল্লাহর কন্যা গণ্য করতো। যদিও তাদের কেউ কাউকে আল্লাহর পিতা গণ্য করার সাহস করেনি। কিন্তু তারা তাদের কোনো কোনো ব্যক্তি বা নবীকে আল্লাহর সন্তান মনে করতে দ্বিধা করেনি। এ সবের উত্তরেই এ সূরায় বলা হয়েছে, তিনি কাউকে জন্ম দেননি আর তাকেও কেউ জন্ম দেয়নি। যদিও মহান আল্লাহ্কে “আহাদ” ও “আস-সামাদ” বললে এসব উদ্ভট ধারণা-কল্পনার মুলে কুঠারাঘাত করা হয়, তবুও এরপর “না তার কোনো সন্তান আছে, না তিনি কারো সন্তান” একথা বলায় এ ব্যাপারে আর কোনো প্রকার সংশয় সন্দেহের অবকাশই থাকে না। তারপর যেহেতু আল্লাহ্র মহান সত্তা সম্পর্কে এ ধরনের ধারণা কল্পনা শিরকের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর অন্তর্ভুক্ত, তাই মহান আল্লাহ্ শুধুমাত্র সূরা ইখলাসেই এগুলোর দ্ব্যর্থহীন ও চূড়ান্ত প্রতিবাদ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়টিকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। এভাবে লোকেরা সত্যকে পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ নীচের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে, “আল্লাহ্ ই হচ্ছেন একমাত্র ইলাহ। কেউ তাঁর পুত্র হবে, এ অবস্থা থেকে তিনি মুক্ত-পাক-পবিত্র। যা কিছু আকাশসমূহের মধ্যে এবং যা কিছু যমীনের মধ্যে আছে সবই তার মালিকানাধীন।” [সূরা আন-নিসা ১৭১] “জেনে রাখো, এরা যে বলছে আল্লাহর সন্তান আছে, এটা এদের নিজেদের মনগড়া কথা। আসলে এটি একটি ডাহা মিথ্যা কথা।” [সূরা আস-সাফ্ফাত ১৫১-১৫২] “তারা আল্লাহ্ ও ফেরেশতাদের মধ্যে বংশীয় সম্পর্কে তৈরি করে নিয়েছে অথচ ফেরেশতারা ভালো করেই জানে এরা (অপরাধী হিসেবে) উপস্থাপিত হবে।” [সূরা আস-সাফ্ফাত ১৮৫] “লোকেরা তার বান্দাদের মধ্য থেকে কাউকে তার অংশ বানিয়ে ফেলেছে। আসলে মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।” [সূরা আয-যুখরুফ ১৫] “আর লোকেরা জিনদেরকে আল্লাহর শরীক বানিয়েছে। অথচ তিনি তাদের স্রষ্টা। আর তারা না জেনে বুঝে তার জন্য পুত্ৰ-কণ্যা বানিয়ে নিয়েছে। অথচ তারা যে সমস্ত কথা বলে তা থেকে তিনি মুক্ত ও পবিত্র এবং তার ঊর্ধ্বে তিনি অবস্থান করছেন। তিনি তো আকাশসমূহ ও পৃথিবীর নির্মাতা। তাঁর পুত্র কেমন করে হতে পারে যখন তাঁর কোনো সঙ্গিনী নেই? তিনি প্রত্যেকটি জিনিস সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আল-আন‘আম ১০০-১০১] “আর তারা বললো, দয়াময় আল্লাহ্ কাউকে পুত্ৰ বানিয়েছেন। তিনি পাক-পবিত্র। বরং (যাদেরকে এরা তাঁর সন্তান বলছে) তারা এমন সব বান্দা যাদেরকে মৰ্যাদা দান করা হয়েছে।” [সূরা আল-আম্বিয়া ২৬] “লোকেরা বলে দিয়েছে, আল্লাহ্ কাউকে পুত্র বানিয়েছেন আল্লাহ্ পাক-পবিত্ৰ! তিনি তো অমুখাপেক্ষী। আকাশসমূহে ও যমীনে যা কিছু আছে সবই তার মালিকানাধীন। এ বক্তব্যের সপক্ষে তোমাদের প্রমাণ কি? তোমরা কি আল্লাহর সম্পর্কে এমন সব কথা বলছো, যা তোমরা জানো না?” [সূরা ইউনুস ৬৮] “আর হে নবী! বলে দিন সেই আল্লাহর জন্য সব প্রশংসা যিনি না কাউকে পুত্ৰ বানিয়েছেন না বাদশাহীতে কেউ তাঁর শরীক আর না তিনি অক্ষম, যার ফলে কেউ হবে তাঁর পৃষ্ঠপোষক।” [সূরা আল-ইসরা ১১১] যারা আল্লাহর জন্য সন্তান গ্রহণ করার কথা বলে, এ আয়াতগুলোতে সর্বতোভাবে তাদের এহেন আকীদা-বিশ্বাসের প্রতিবাদ করা হয়েছে। এ আয়াতগুলো এবং এ বিষয়বস্তু সম্বলিত অন্য যে সমস্ত আয়াত কুরআনের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যায়, সেগুলো সূরা ইখলাসের অতি চমৎকার ব্যাখ্যা।
রুকু করুন
আল্লাহু আকবার বলে ঝুঁকুন, পিঠ সোজা রাখুন এবং হাত হাঁটুর উপর রাখুন। তিনবার বলুন:
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ
সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম
পবিত্র আমার রব, যিনি মহান।
সহীহ মুসলিম ৭৭২ (হুযাইফা)
রুকু থেকে উঠুন
সোজা হয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলুন:
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ
সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ
যে আল্লাহর প্রশংসা করে, আল্লাহ তার কথা শোনেন।
তারপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বলুন:
رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ
রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ
হে আমাদের রব, সকল প্রশংসা আপনারই।
সহীহ বুখারী ৭৮৯
সিজদা করুন
আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় যান। সাতটি অঙ্গ মাটি স্পর্শ করে: নাকসহ কপাল, দুই হাত, দুই হাঁটু ও দুই পায়ের আঙুল (সহীহ বুখারী ৮১২, সহীহ মুসলিম ৪৯০)। তিনবার বলুন:
سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى
সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা
পবিত্র আমার রব, যিনি সর্বোচ্চ।
সহীহ মুসলিম ৭৭২ (হুযাইফা)
সিজদায় বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছে থাকে, তাই এখানে দোয়াও করুন (সহীহ মুসলিম ৪৮২)।
দুই সিজদার মাঝে বসুন
আল্লাহু আকবার বলে শান্ত ও স্থির হয়ে বসুন। বলুন:
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
রাব্বিগফিরলী, রাব্বিগফিরলী
হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন। হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা করুন।
সুনানে ইবনে মাজাহ ৮৯৭, সুনানে আবু দাউদ ৮৭৪
দ্বিতীয় সিজদা করুন
আল্লাহু আকবার বলে প্রথমটির মতোই দ্বিতীয় সিজদা করুন, এবং তিনবার সুবহানা রাব্বিয়াল আ'লা বলুন। এতে প্রথম রাকাত পূর্ণ হলো।
দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ান
আল্লাহু আকবার বলে দাঁড়ান। ৪ থেকে ১০ নম্বর ধাপ আবার করুন: সূরা আল-ফাতিহা, আরেকটি সূরা, রুকু, দাঁড়ানো, দুটি সিজদা ও তার মাঝের বসা। শুরুর দোয়া (সানা) আবার পড়তে হয় না।
বসে তাশাহহুদ পড়ুন
দ্বিতীয় রাকাতের দ্বিতীয় সিজদার পর বসে থাকুন এবং তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) পড়ুন। অনেকে সাক্ষ্যের শব্দগুলোর সময় ডান হাতের শাহাদাত আঙুল তোলেন।
التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ، السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ، أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত তাইয়্যিবাত। আস্সালামু আলাইকা আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। আস্সালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন। আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ।
সকল অভিবাদন, নামাজ ও পবিত্র কথা আল্লাহর জন্য। হে নবী, আপনার উপর সালাম এবং আল্লাহর রহমত ও তাঁর বরকত। আমাদের উপর ও আল্লাহর নেক বান্দাদের উপর সালাম। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।
ইবনে মাসউদের তাশাহহুদ · সহীহ বুখারী ৮৩১, সহীহ মুসলিম ৪০২
নবীর উপর দরুদ পড়ুন
শেষ বৈঠকে নবী ﷺ-এর উপর দরুদ পড়ুন:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুন মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আলি ইবরাহীম, ইন্নাকা হামীদুন মাজীদ।
হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবারের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের পরিবারের উপর বরকত দিন, যেমন আপনি ইবরাহীম ও ইবরাহীমের পরিবারের উপর বরকত দিয়েছেন; নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।
সহীহ বুখারী ৩৩৭০ (কা'ব ইবনে উজরা)
একটি ছোট দোয়া করুন
সালামের আগে আল্লাহর কাছে যেকোনো কল্যাণ চান। কুরআনের একটি দোয়া যা অনেকে পড়েন:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাহ, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়া কিনা আযাবান নার
আর তাদের মধ্যে যারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন [১]।’
টীকা
২:২০১ [১] আবদুল্লাহ ইবন সায়েব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কাবার দুই রুকনের মাঝখানে এ দোআ বলতে শুনেছি’। [আবুদাউদ ১৮৯২] আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই এ দোআ করতেন। [বুখারী ৪৫২২, মুসলিম ২৬৯০]
সালাম ফিরিয়ে শেষ করুন
ডান দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাম বলুন, তারপর বাম দিকে মুখ ফিরিয়ে আবার বলুন (সহীহ মুসলিম ৫৮২)। আপনার নামাজ পূর্ণ হলো।
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ
আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ
আপনাদের উপর শান্তি এবং আল্লাহর রহমত।
অর্থানুবাদ: Abu Bakr Zakaria, QuranEnc.com, তালিকাবহির্ভূত সংস্করণ, সংগৃহীত ২০২৬-১০-১৯। অনুবাদ কুরআনের অর্থ তুলে ধরে। মূল কুরআন হলো আরবি পাঠ।
তিন ও চার রাকাতের নামাজ
মাগরিব (৩), এবং যোহর, আসর ও এশা (৪)-এর জন্য প্রথম দুই রাকাত উপরের মতো পড়ুন। দ্বিতীয় রাকাতের তাশাহহুদের পর দরুদ বা সালাম পড়বেন না। আল্লাহু আকবার বলে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ান।
ফরজ নামাজের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে শুধু সূরা আল-ফাতিহা পড়ুন, অতিরিক্ত সূরা নয়। শেষ রাকাতের পর বসে তাশাহহুদ, দরুদ ও দোয়া পড়ুন, তারপর সালাম ফিরিয়ে শেষ করুন।
ফজর, এবং মাগরিব ও এশার প্রথম দুই রাকাত ইমাম উচ্চস্বরে পড়েন (এবং একা নামাজ পড়া পুরুষও, অধিকাংশ মাযহাবে)। যোহর ও আসর নিচু স্বরে পড়া হয়।
প্রতিটি নামাজের রাকাত
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মোট ১৭ রাকাত ফরজ। এগুলোর আগে-পরের সুন্নত নামাজগুলো হলো সেগুলো, যা নবী ﷺ নিয়মিত পড়তেন। বারো রাকাত সুন্নতের ফজিলত সম্পর্কে দেখুন সহীহ মুসলিম ৭২৮; বারো রাকাতের তালিকা আছে জামে তিরমিযী ৪১৫-এ।
| নামাজ | আগের সুন্নত | ফরজ | পরের সুন্নত | কিরাত |
|---|---|---|---|---|
| ফজর | ২ | ২ | — | উচ্চস্বরে |
| যোহর | ৪ (বা ২) | ৪ | ২ | নিচু স্বরে |
| আসর | ৪ (ঐচ্ছিক) | ৪ | — | নিচু স্বরে |
| মাগরিব | — | ৩ | ২ | প্রথম দুই রাকাত উচ্চস্বরে |
| এশা | ৪ (ঐচ্ছিক) | ৪ | ২, তারপর বিতর | প্রথম দুই রাকাত উচ্চস্বরে |
যোহর: হানাফি মাযহাবে আগে ৪ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা; শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবে ২ রাকাত মুয়াক্কাদা (৪ রাকাত মুস্তাহাব), ইবনে উমরের ২ রাকাতের বর্ণনা অনুযায়ী (সহীহ বুখারী ১১৮০)। বিতর: হানাফিদের কাছে ওয়াজিব এবং সবসময় ৩ রাকাত; বাকি তিন মাযহাবে ১ বা তার বেশি রাকাতের জোরালো সুন্নত।
জুমা, ঈদ, তারাবিহ ও তাহাজ্জুদসহ পূর্ণ বিবরণ: কোন নামাজ কত রাকাত (ইংরেজি)।
মাযহাবগুলোর মধ্যে ছোট পার্থক্য
চার সুন্নি মাযহাবই একই নামাজ পড়ে। কিছু খুঁটিনাটিতে তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে, এবং প্রত্যেকেই দলিল অনুসরণ করে। এসব পার্থক্যের কোনোটিই নামাজ বাতিল করে না।
- হাত: হানাফিরা নাভির নিচে বাঁধেন; শাফেয়ি ও হাম্বলিরা বুকের উপর বা তার একটু নিচে; অনেক মালিকি হাত দুই পাশে ছেড়ে রাখেন।
- হাত তোলা: হানাফিরা শুধু তাকবিরে তাহরিমার সময় তোলেন; শাফেয়ি ও হাম্বলিরা রুকুর আগে ও পরেও তোলেন (সহীহ বুখারী ৭৩৫)।
- শুরুর দোয়া: হানাফি ও হাম্বলিরা সাধারণত সুবহানাকাল্লাহুম্মা পড়েন; শাফেয়িরা প্রায়ই ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া পড়েন (সহীহ মুসলিম ৭৭১)। মালিকিরা ফরজ নামাজে শুরুর দোয়া পড়েন না।
- আমীন: শাফেয়ি ও হাম্বলিরা উচ্চস্বরের নামাজে সূরা আল-ফাতিহার পর জোরে বলেন; হানাফিরা নিচু স্বরে বলেন।
আপনাকে যা শেখানো হয়েছে বা আপনার এলাকার মসজিদ যা অনুসরণ করে, সেটাই অনুসরণ করুন। এগুলোর কোনটি বেছে নিচ্ছেন তার চেয়ে নিয়মিত থাকা বেশি জরুরি।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
আরবিতে সূরা আল-ফাতিহা এখনো না জানলে কি নামাজ পড়তে পারব?
হ্যাঁ, এখনই শুরু করুন এবং পড়তে পড়তে শিখুন। এক ব্যক্তি নবী ﷺ-কে বললেন যে তিনি কুরআনের কিছুই শিখতে পারছেন না, তখন তাকে এর বদলে সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদু লিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ বলতে শেখানো হয় (সুনানে আবু দাউদ ৮৩২)। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সূরা আল-ফাতিহা শিখে নিন, কারণ নামাজ আরবিতে পড়া হয়।
নিয়ত কি মুখে জোরে বলতে হবে?
না। নিয়ত অন্তরে (সহীহ বুখারী ১)। হানাফি ও শাফেয়ি মাযহাবের কিছু আলেম মনোযোগের জন্য নিচু স্বরে বলাকে সহায়ক মনে করেন; অন্যরা একে নিরুৎসাহিত করেন। যেভাবেই হোক, অন্তরের নিয়তেই নামাজ সহীহ।
কী কী কারণে নামাজ ভেঙে যায়?
ইচ্ছাকৃত কথা বলা, খাওয়া বা পান করা, জোরে হাসা, বুক কিবলা থেকে ফিরিয়ে নেওয়া, অজু ভেঙে যাওয়া, অথবা রুকু বা সিজদার মতো কোনো রুকন ছেড়ে দেওয়া। নামাজে কথা বলা সম্পর্কে দেখুন সহীহ মুসলিম ৫৩৭।
কোনো ধাপ ভুলে গেলে বা রাকাতের সংখ্যা ভুলে গেলে কী করব?
যেটুকু নিশ্চিত, তার উপর ভিত্তি করুন এবং দুটি অতিরিক্ত সিজদা করুন, যাকে সিজদায়ে সাহু বলা হয় (সহীহ মুসলিম ৫৭১)। দেখুন সিজদায়ে সাহু (ইংরেজি)।
নারীদের নামাজ কি আলাদা?
ধাপ ও শব্দগুলো একই। কিছু মাযহাব, প্রধানত হানাফি, নারীদের জন্য ভঙ্গিতে ছোট কিছু পার্থক্যের কথা বলে, যেমন সিজদায় বাহু শরীরের কাছাকাছি রাখা।
দুই রাকাত নামাজে কত সময় লাগে?
শান্তভাবে পড়লে প্রায় তিন থেকে পাঁচ মিনিট। ধীরস্থিরতা জরুরি: নবী ﷺ তাড়াহুড়া করে নামাজ পড়া এক ব্যক্তিকে আবার পড়তে বলেন এবং প্রতিটি অবস্থায় স্থির থাকতে শেখান (সহীহ বুখারী ৭৫৭)।
আরও পড়ুন
এই গাইড প্রচলিত আমল তার সূত্রসহ ব্যাখ্যা করে। এটি কোনো ফতোয়া নয়। আপনার পরিস্থিতি ভিন্ন হলে আপনার আস্থাভাজন কোনো আলেমকে জিজ্ঞেস করুন।